প্রকাশনা শিল্পে ক্ষতি

1298656036-sale-breaks-record-in-bangla-academy-ekushey-book-fair-2011_603506-300x300তামান্না খান : সম্প্রতি দুই তরুণ প্রকাশকের উপর হামলায় দেশের বই প্রকাশনা শিল্পের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে টিকে থাকার জন্য এমনিতেই যুদ্ধ করছে প্রকাশনা শিল্পটি।

লেখক ও প্রকাশকরা জানান, হুমায়ুন আহমেদের প্রয়াণের মধ্য দিয়ে তরুণ পাঠকদের মধ্যে যে লেখক শূন্যতা তৈরি হয়েছে নতুন করে তরুণ দুই প্রকাশকের উপর হামলা তা মরার উপর খাড়ার ঘাঁ’এর শামিল। ১৯৮০ সাল থেকে হুমায়ূন আহমেদ অসংখ্য তরুণ পাঠক পেয়েছিলেন। তিনি বিজ্ঞান, দর্শন ও মানবিকতার বই লিখে পাঠকদের ধরে রেখেছেন দীর্ঘকাল ধরে।

সাহিত্য প্রকাশের স্বত্ত্বাধিকারী মফিদুল হক বলেন, গত ৮-১০ বছর তরুণ-তরুণীরা প্রকাশনা শিল্পের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। এই তরুণ লেখকরা চেষ্টা করেছেন বাংলাদেশের মৌলিক মুল্যবোধ ও বুদ্ধিমত্তাকে তুলে ধরতে। একটি সমাজের মুক্ত চিন্তা ও ধারণার প্রয়োজন। সমাজে সহিষ্ণুতা বজায় রাখা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। এটি সরকারের দায়িত্ব। গতিশীল সমাজকে রোধ করতে যারা বাধা দিচ্ছে তাদের প্রতিরোধ করতে হবে।

পার্ল পাবলিকেশন্সের স্বত্ত্বাধিকারী হাসান জাইদি বলেন, আমরা বিজ্ঞানভিত্তিক লেখার দিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি। কারণ বর্তমান বাজারের পাঠকদের মধ্যে বিজ্ঞান বিষয়ক বই বেশি চায়। বাজারে বিজ্ঞানভিত্তিক বইয়ের চাহিদা অনেক বেশি।
প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন ও আহমেদ রাশিদ টুটুল মুক্তচিন্তার লেখকদের লেখা বেশি প্রকাশ করতেন। মানুষের মনের বিকাশের জন্যই এ মুক্তচিন্তার বই প্রকাশ করা হতো। ৩১ অক্টোবর ধর্মীয় চরমপন্থীরা দীপনকে বর্বরভাবে হত্যা করে। একই দিনে টুটুলসহ আরো দুই ব্লগার রানাদিপাম বসু ও তারেক রহিমকে মারাত্মকভাবে আহত করা হয়। আহত এই তিনজন ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা করানো হচ্ছে। অনেক প্রকাশক এখন সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর বই ছাপাতে আগ্রহ প্রকাশ করছে না।

আহমেদ পাবলিশিং এর স্বত্ত্বাধিকারী এবং একাডেমিক এ- ক্রিয়েটিভ পাবলিশার এসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মেছবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, কি ধরনের বই ছাপানো যাবে আর কি ধরনের বই ছাপানো যাবে না এই বিষয়টি নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করা হচ্ছে।

শ্রাবন প্রকাশনীর প্রকাশক রবিন আহসান বলেন, স্পর্শকাতর বই প্রকাশ করে মার্কেটিংয়ের জন্য প্রদর্শন করা হলে হামলার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা আছে। দীপন ও টুটুল তরুণ পাঠকদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন বলে জানান তরুণ কবি প্রান্ত পলাশ। গত বছর বই মেলায় টুটুলের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে বই বিক্রি শীর্ষ তালিকায় ছিল। তারা দুজনই মৌলবাদীদের বই না ছাপানোর ঘোষণা করেছিলেন বলে জানান এই তরুণ কবি।

ইউনির্ভাসিটি প্রেস লিমিটেডের মার্কেটিং ও বিজনেস ডেভলপমেন্ট পরিচালক মাহরুক মহিউদ্দিন বলেন, স্পর্শকাতর বই ছাপানো নিয়ে আরো সচেতনভাবে কাজ করছি। ধর্মীয় বিষয়গুলো নিয়ে প্রকাশক ও লেখকদের মধ্যে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বলাকা প্রকাশের শারীফা বুলবুল বলেন, প্রকাশনা নির্ভর করে একজন লেখকের লেখনির গুণের উপর। এক্ষেত্রে লেখকের ব্যক্তিগত বিশ্বাস বিবেচনার বিষয় নয়। লেখক বিশ্বাসী না অবিশ্বাসী এই বিবেচনায় বই ছাপানো হয় না। মুক্তচিন্তার বই ছাপানোর জন্য প্রতিনিয়তই হুমকি পাচ্ছেন বলে তিনি জানান। তারপরেও নীরবে বসে থাকিনি। হুমকিতে আমরা ভীত নই তবে আমরা উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত। প্রতিটি ধর্মের অনুশীলন করার অধিকার রয়েছে। মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান ধর্মের অনুশীলন করার যেমন অধিকার রয়েছে তেমন বিশ্বাস না করারও অধিকার রয়েছে। প্রকাশকরা আর্থিকভাবে চাপে পরেছেন বলে তাদের পক্ষ থেকে জানানো হবে।

বাংলা একাডেমির ডেপুটি ডিরেক্টর মুর্শিদ আনোয়ার বলেন, ননফিকশন বই যেমন, গবেষণার বই, সামাজিক বই, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, সাহিত্যের বই ও অর্থনৈতিক ইস্যু নিয়ে অমর একুশে বই মেলার মোট বই বিক্রির মাত্র ২০ শতাংশ। বইকে টিকিয়ে রাখার জন্য এই সংখ্যা খুবই নগন্য।

একাডেমিক ও ক্রিয়েটিভ পাবলিশার এসোশিয়েশন অব বাংলাদেশ এর মোস্তফা সেলিম বলেন, ধর্মীয় স্পর্শকাতর বিষয়ে বই লেখা না হলে বই ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়বে না। তবে স্বাধীনভাবে চিন্তা করে নতুন উদ্বাবনী চিন্তা সীমাবদ্ধই থেকে যাবে।

অনুপম প্রকাশনীর স্বত্ত্বাধিকারী মিলন নাথ বলেন, একই ভুখন্ডে লেখকরা আলাদা নয়। সমাজে যদি সহিষ্ণুতা না থাকে তাহলে সৃষ্টিশীলতা হ্রাস পাবে।

দ্য ডেইলি স্টার থেকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *