কিভাবে বুঝবেন শরীরে টক্সিক বাসা বাঁধছে

2E60333100000578-3315295-image-a-1_1447329232076নুবালা তুনাজ্জিনা : প্রতিদিন যে খাবার খাই তাতে কিছু না কিছু টক্সিন শরীরে ঢুকে পড়লেও এ্যান্টি বডি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তা মোকাবেলা করে। কিন্তু যখন তা পেরে ওঠে না তখনই তা শরীরে জমা হতে থাকে। কলকারখানা থেকে নির্গত ক্ষতিকারক পদার্থের কথাই ধরুন। যারা একটু খোঁজখবর রাখেন তারা জানেন, অনেক কিছুতেই টক্সিক বা বিষাক্ত পদার্থ থাকতে পারে। এই যে আমরা ভেষজ খাই তাতেও কিন্তু অনেক ক্ষতিকারক টক্সিক থাকে যা দূর বা পরিশোধন করে বানানো হয় ওষুধ। এটা তো আর ওষুধ ল্যাবরেটরি ছাড়া ঘরে কেউ করতে পারে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের শরীরে রোজ ক্ষতিকারক টক্সিক পদার্থ বা টক্সিন প্রবেশ করছে, অবাধে। কখনও আমরা অজান্তেই তা শরীরে প্রবেশ করাচ্ছি। আবার কখনও জেনেশুনে বিপদ ডেকে আনছি। নি:শ্বাসে কলকারখানার ধোঁয়া বা গাড়ির কালো ধোঁয়া তো রয়েছেই। ধরুন ওই হাজারিবাগ ট্যানারির বর্জ্য বুড়িগঙ্গায় মিশে কত জায়গায় না ছড়িয়ে পড়ছে।
আপনি জেনেই করুন বা না জেনে, বিষ আপনাকে প্রত্যহ ‘পান’ করতেই হচ্ছে। ধূমপান না করলেও। শরীরে অত্যাধিক টক্সিন জমা হলে, তা শরীরই জানান দেয়। কী দেখে বুঝবেন আপনার শরীরেও জমে রয়েছে প্রচুর টক্সিন। তাহলে বুঝে নিন।

১. কোষ্ঠকাঠিন্য: কোলন বা লার্জ ইন্টেস্টাইন প্রতিদিন মলের সঙ্গে শরীরের টক্সিন বাইরে বার করে দেয়। টক্সিনের প্রভাবে কোলন তার স্বাভাবিক কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এ ক্ষেত্রে বেশি করে পানি খান। হাই-ফাইবারযুক্ত বা আঁশযুক্ত খাবার যেমন শাক সবজি, ফল, ডাটা এবং প্রোবায়োটিক খাবার বেশি করে খান। তাতে কোলন স্বাভাবিকভাবেই শরীর থেকে টক্সিন তাড়ানোর কাজ করতে থাকবে।

২. ওজন বেড়ে যাওয়া: কিছুই খাচ্ছেন না, অথচ ওজন বেড়ে যাচ্ছে। অনেক চেষ্টা করে, কসরত করে ওজন কমানো যাচ্ছে না। টক্সিনের প্রভাব হতে পারে। ক্যানবন্দি খাবার, সফ্ট ড্রিংক, রাসায়নিকযুক্ত খাবার ইত্যাদি ক্রমাগত শরীরে প্রবেশ করার ফলে এমনটা হয়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, গর্ভবতী মায়েরা এ সব খাবার খেলে শিশুর ওপরও তার প্রভাব পড়ে।

৩. একটুতেই ক্লান্ত : রোজকার সাধারণ কাজ করতেই হাঁপিয়ে উঠছেন। অফিস থেকে ফিরে বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছে না। এ সব হলে বুঝবেন শরীরে টক্সিন জমা হয়েছে। টক্সিন আমাদের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এর ফলে কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়।

৪. চর্মরোগ: চামড়া বা ত্বক আমাদের দেহ থেকে টক্সিন বার করে দিতে খুব সহায়তা করে। অন্ত্র এবং লিভার যখন খাবারে থাকা টক্সিন বার করতে পারে না তখন ত্বক সেই টক্সিন বার করার চেষ্টা করে। এর ফলেই ফোঁড়া, র‌্যাশ, অত্যাধিক ঘাম হওয়া ইত্যাদি লক্ষণ প্রকাশ পায়।

৫. মাথা যন্ত্রণা, মাইগ্রেন: টক্সিনের অন্যতম লক্ষ্য হল মস্তিষ্কের সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমে বাসা বেঁধে বসে যাওয়া। এর ফলে ব্রেনের বিভিন্ন টিস্যু খুব অনুভূতিপ্রবণ হয়ে পড়ে। সামান্য কারণেই এই টিস্যুতে যন্ত্রণা দেখা যায়। একেই ডাক্তারি ভাষায় মাইগ্রেন বলা হয়। তা ছাড়া শরীরের নিজস্ব টক্সিনও থাকে। যেমন নাইট্রিক অক্সাইড। এর ফলেও মাইগ্রেনের ব্যথা হয়।

৬. মুড সুইং: প্রসেসড ফুড, অ্যাডিটিভ অবং কৃত্রিম উপায়ে তৈরি খাবার, জেনেটিক্যালি ইঞ্জিনিয়ার্ড খাবার থেকে এক ধরনের টক্সিন শরীরে ঢোকে যাতে জেনোইস্ট্রোজেন থাকে। এ ধরনের টক্সিন হঠাৎ হঠাৎ মেজাজ বিগড়ে দিতে ওস্তাদ। শুধু তাই নয়, এস্পার্টেম নামে আরও এক ধরনের টক্সিন এর মাধ্যমেই শরীরে প্রবেশ করে যা ফলে ডিপ্রেশন হয়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যারা এ সব খাবার বেশি খান বা এ সব খাবার তৈরিতে কাজ করেন, তারা ও তাদের গোটা পরিবারই ডিপ্রেশনের শিকার।

৭ . নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ: বার বার ব্রাশ করেও মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে পারছেন না? আসল সমস্যা কিন্তু দাঁত না-ও হতে পারে। প্রসেসড ফুড খাওয়ার ফলে শরীরে অত্যাধিক মাত্রায় শর্করা প্রবেশ করে। যাতে ক্ষতিকারক ব্যাক্টেরিয়া তৈরি হয় এবং বাড়তে থাকে। তা পরিপাক তন্ত্র তো বটেই সঙ্গে মুখ এবং হলার কাছেও বাসা বাঁধে। ফলে মুখের দুর্গন্ধ থেকে মুক্তি পান না। এর আরও কতগুলি লক্ষণ রয়েছে। অত্যাধিক ঢেকুর ওঠা, হজমের সমস্যা ইত্যাদি।

৮. পেশিতে ব্যথা এবং কালশিটে: কোনও চোট লাগেনি, কিন্তু শরীরের বিভিন্ন পেশিতে ব্যথা হচ্ছে। সঙ্গে রয়েছে কালশিটে। এটা অত্যাধিক টক্সিনের লক্ষণ। খাবার, ঘর পরিষ্কার করার বিভিন্ন জিনিস, প্রসাধনী ইত্যাদি ক্রমাগত ব্যবহারের ফলে আমাদের শরীরের স্ট্রেস ডিফেন্স সিস্টেম ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে পেশিতে অক্সিজেনের জোগান কমে যায়। তার ফলেই পেশিতে ব্যথা হয়। সঙ্গে কালশিটেও পড়ে যায়। ক্লান্তির সঙ্গে যদি পেশিতে ব্যথা অনুভব করেন, তা হলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এ ধরনের ব্যথা ফিজিও থেরাপির ফলে কমতে পারে।

৯. ইনসমনিয়া: কলকারখানায় কাজ, ঘরে টক্সিনযুক্ত রঙ লাগানো, বিভিন্ন টক্সিনযুক্ত ডিটারজেন্ট এবং সিসাযুক্ত রুম ফ্রেশনার ব্যবহার বেশি করলে ইনসমনিয়া বা অনিদ্রা রোগ হতে পারে। এ ধরনের টক্সিন স্নায়ুতন্ত্র খুব দ্রুত শুষে নেয়। রক্তের সঙ্গে তাড়াতাড়ি মিশতে পারে এরা। এর ফলেই অনিদ্রার সমস্যা দেখা যায়। ঘুমিয়ে থাকাকালীন ব্রেনের মধ্যে জমে থাকা টক্সিন বার করে আমাদের শরীর। এই টক্সিনগুলো তাই ঘুমের ঘাটতি তৈরি করে, যাতে শরীর থেকে সহজে তাদের বাইরে বার না করা যায়।

১০. শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া, ঘাম হওয়া: অত্যাধিক টক্সিন শরীরে জমা হলে রক্তের সঙ্গে তা লিভারে পৌঁছায়। লিভার তখন সেই টক্সিন মিশ্রিত রক্ত শোধন করতে অতিরিক্ত খাটে। এর ফলেই দেহের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। প্রচুর ঘামও হয়। ঘামের সঙ্গে টক্সিন বেরিয়ে গেলেও এটা আপনাকে জানান দিচ্ছে, টক্সিনের জন্য শরীরকে অতিরিক্ত খাটতে হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *