চির শ্রদ্ধায় ‘বেগম’কে বিদায়

noorjahanরিবাতুল ইসলাম : কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা শেষে ‘বেগম’ সম্পাদক নূরজাহান বেগমকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। সোমবার বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আনা হয় নূরজাহানের মরদেহ।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আনার পরই শ্রদ্ধার ফুলে ছেয়ে যায় নূরজাহানের কফিন। তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক- সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সর্বস্তরের মানুষ। তাঁর মৃত্যুতে দেশ নারীজাগরণের অন্যতম এক পথিকৃৎকে হারাল, শেষ বিদায়ের বেলায় সে কথাই ঘুরেফিরে বললেন সবাই।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসেছিলেন ‘বেগম’-এর আলোকচিত্রী সাঈদা খানম। তিনি বলেন, ‘প্রথম থেকেই আমি বেগমের ছবি তুলেছি।’

মহিলা পরিষদের সভানেত্রী আয়েশা খানম বলেন, ‘হিমালয়সম আমাদের নারী প্রগতি কিন্তু আমরা জানি এখনো অনেক জায়গা অন্ধকার। তাঁরা ছোট্ট প্রদীপ জ্বালিয়েছেন, কিন্তু অনেক বড় আলো তৈরি করার চেষ্টা করেছেন।’

মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল বলেন, ‘আজ আমি যে এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছি, কোনো না কোনোভাবে নূরজাহানের অবদান রয়েছে।’

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘বেগম পত্রিকার প্রকাশ যাতে অব্যাহত থাকে, সেদিকে লক্ষ রেখে আমাদের দিক থেকে যথাসম্ভব সহায়তা করার জন্য আমরা অবশ্যই চেষ্টা করব।’

শ্রদ্ধা জানাতে আসা বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘এ দেশে নারী পুনর্জাগরণের যে আন্দোলন, নারীদের ক্ষমতায়নের যে আন্দোলন, সেখানে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন।’

বাদ জোহর পুরান ঢাকার শরৎ গুপ্ত রোডের বাড়িতে নূরজাহান বেগমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বাদ মাগরিব গুলশান এক নম্বর জামে মসজিদে জানাজা শেষে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

এর আগে সকালে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে মারা যান ৯১ বছর বয়সী নূরজাহান বেগম। গত ৫ মে অসুস্থ অবস্থায় নূরজাহানকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বার্ধক্যজনিত কারণে অবস্থার অবনতি হলে গত ৭ মে থেকে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন তিনি। তিনি শ্বাসকষ্টের সমস্যায় ভুগছিলেন।

নুরজাহান বেগমের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

নূরজাহান বেগমের বড় মেয়ে ফ্লোরা নাসরিন খান জানিয়েছেন, হাসপাতালের আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাঁর মায়ের মরদেহ পুরান ঢাকার শরৎ গুপ্ত রোডের বাড়িতে নেওয়া হবে। সেখানে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর তাঁকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হবে। ৫ মে অসুস্থ অবস্থায় নূরজাহান বেগমকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে ৭ মে তাঁকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নিয়ে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়।

বেগম পত্রিকা
বেগম পত্রিকার প্রকাশনা শুরু হয় ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই যখন নূরজাহান বেগম বিএ শ্রেণীতে পড়তেন। তাঁর বাবা নাসিরুদ্দীন প্রতিষ্ঠিত বেগম পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন সুফিয়া কামাল। প্রথম চার মাস সম্পাদক হিসেবে এর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। নূরজাহান বেগমের মতো যারা সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল ও লেডি বেবোর্ন কলেজে পড়তেন তারা সবাই মিলে বেগম-এর জন্য কাজ করতেন। বেগমের শুরু থেকে নূরজাহান বেগম ছিলেন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। তিনি বিয়ে করেন রোকনুজ্জামান খান (দাদা ভাই)কে। ১৯৫০ সালে তাঁরা বাংলাদেশে চলে আসেন। ঢাকায় এসে নারীদের ছবি আঁকতে, লেখার জন্য উৎসাহী দিতেন নূরজাহান বেগম, যাতে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ে। যারা লেখা পাঠাত, তাদের ছবিও ছাপাতেন বেগম পত্রিকা। প্রথমদিকে পুরুষরাও এতে লিখতেন। তবে এখন এতে শুধুমাত্র নারীরাই লিখে থাকেন। ১৯৫৪ সালে মার্কিন মহিলা সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও সমাজকর্মী মিসেস আইদা আলসেথ ঢাকায় বেগম পত্রিকা অফিস পরিদর্শন করেন। ১৯৫৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বেগম ক্লাব’ প্রতিষ্ঠিত হয় যার প্রেসিডেন্ট হন বেগম শামসুন নাহার মাহমুদ, সেক্রেটারি হন নূরজাহান বেগম এবং বেগম সুফিয়া কামাল ছিলেন এর অন্যতম উপদেষ্টা।

প্রাথমিক জীবন
নূরজাহান বেগমের মার নাম ফাতেমা বেগম। ১৯২৯ সালে সাড়ে তিন বছর বয়সে মা আর মামা ইয়াকুব আলী শেখের সঙ্গে তিনি কলকাতায় বাবার বাসায় চলে যান যা ছিলো কলকাতার ১১ নম্বর ওয়েলেসলি স্ট্রিটের দোতলা বাড়ি, সওগাত পত্রিকার দপ্তর। সওগাত পত্রিকা অফিসে নিয়মিত সাহিত্য মজলিস বসত যেখানে যোগ দিতেন কাজী নজরুল ইসলাম, খান মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন, আবুল মনসুর আহমদ, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, হবীবুল্লাহ বাহার, ইব্রাহীম খাঁ, কাজী মোতাহার হোসেন প্রমুখ৷ এই সাহিত্য মজলিসের নিয়মিত শ্রোতা ছিলেন নূরজাহান। তাঁর প্রথম স্কুল সাখাওয়াত মেমোরিয়াল বিদ্যালয়ে যেখানে তিনি শিশু শ্রেণীতে ভর্তি হন। তাঁর মা প্রতিদিন স্কুলে খাওয়ার জন্য টিফিনে পরোটা, ডিম, হালুয়া, মিষ্টি দিলেও এক উর্দুভাষী মেয়ের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে নূরীকে ফুসলিয়ে তার দুটো গুলগুললার বিনিময়ে তাঁর ভালো ভালো টিফিনগুলো খেয়ে ফেলত। এই ঘটনা তাঁকে পরবর্তীতে মানুষ চিনতে সাহায্য করেছে।

শিক্ষা জীবন
নূরজাহান বেগমের প্রথম স্কুল ছিল সাখাওয়াত মেমোরিয়াল বিদ্যালয়। তাঁর দ্বিতীয় স্কুল বেলতলা উচ্চ যেখানে তিনি দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন। এখানে তিনি চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর পঞ্চম শ্রেণীতে আবার আগের বিদ্যালয় সাখাওয়াত মেমোরিয়াল বিদ্যালয় ভর্তি হন যা অবস্থিত ছিল ১৭নং লর্ড সিনহা রোডের তিনতলা ভবনে। অষ্টম শ্রেণী থেকে ম্যাট্রিক পর্যন্ত তিনি ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশুনা করে ১৯৪২ সালে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। তারপর আই এ ভর্তি হন কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ণ কলেজে। তাঁর আই এ তে পড়ার বিষয় ছিল দর্শন, ইতিহাস ও ভূগোল। এখানে তাঁর সহপাঠী ছিল সাবেরা আহসান ডলি, রোকেয়া রহমান কবির, সেবতি সরকার, জ্যোৎস্না দাশগুপ্ত, বিজলি নাগ, কামেলা খান মজলিশ, হোসনে আরা রশীদ, হাজেরা মাহমুদ, জাহানারা ইমাম। পড়াশুনার পাশাপাশি তিনি কলেজে ব্যাডমিন্টন খেলতেন। লেডি ব্রেবোর্ণ থেকে ১৯৪৪ সালে আই এ পাশ করে বি এতে ভর্তি হন। এই কলেজ থেকে তিনি ১৯৪৬ সালে বি এ ডিগ্রি লাভ করেন।

সম্মাননা
নূরজাহান বেগম অনেক সম্মাননা লাভ করেছেন এ পর্যন্ত। ১৯৯৬ সালে তিনি শ্রেষ্ঠ ব্যাক্তিত্ত্ব হিসেবে নন্দিনী সাহিত্য ও পাঠ চক্রের সন্মাননা লাভ করেন। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার থেকে রোকেয়া পদক, ১৯৯৯ সালে গেন্ডারিয়া মহিলা সমিতি থেকে শুভেচ্ছা ক্রেস্ট , ২০০২ সালে অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার, ২০০৩ ও ২০০৫ সালে নারী পক্ষ দুর্বার নেটওয়ার্ক ও কন্যা শিশু দিবস উদযাপন কমিটির পক্ষ থেকে তিনি সংবর্ধনা লাভ করেন। এছাড়াও তিনি সংবর্ধিত হয়েছেন বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ, চট্রগ্রাম লেডিজ ক্লাব, চট্রগ্রাম লেখিকা সংঘ, ঢাকা লেডিজ ক্লাব, ঋষিজ শিল্প গোষ্ঠী, বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্র প্রভৃতি সংগঠনের মাধ্যমে। স্বর্ণপদক পেয়েছেন বাংলাদেশ মহিলা সমিতি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, লেখিকা সংঘ, কাজী জেবুনন্নেসা মাহাবুবুল্লাহ ট্রাষ্ট, বাংলাদেশ সাংবাদিক ফোরাম, রোটারি ক্লাব প্রভৃতি সংগঠন থেকে। ২০১০ সালে পত্রিকা শিল্পে তাঁর অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক নারী সংগঠন ইনার হুইল ডিস্ট্রিক্ট ৩২৮ সম্মাননা পান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *