সেই হ্যান্ডি ফিরাত এরদোগানের ধন্যবাদ পাননি

1,w=650,c=0.bildমোবাইল ফোনের মাধ্যমে সিএনএন তুর্কের সাংবাদিক হ্যান্ডি ফিরাত তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইপে এরদোগানের বক্তব্য তার আইফোনে নিয়ে দেশটিকে সেনা অভ্যুত্থান থেকে রক্ষা করেছেন। জামার্নির বিল্ড পত্রিকায় ওই সময়ের বিষয়বস্তু নিয়ে কথা বলেছেন সাংবাদিক হ্যান্ডি ফিরাত।

বিল্ড: উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কথা প্রেসিডেন্ট এরদোগান কিভাবে বর্ণনা করছিলেন দয়া করে আমাদের বলেন। ওইটি কি আপনার ফোন ছিল যার মাধ্যমে আমরা টিভিতে তাকে দেখতে পেয়েছিলাম?

ফিরাত: হ্যাঁ ওইটি আমার নিজের ফোন ছিল। সারারাত ফোনটি আমার হাতেই ছিল।

বিল্ড: প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সঙ্গে কথা বলার সময় আপনার অনুভূতি কেমন ছিল?

ফিরাত: আমার কেমন লেগেছিল তা শুরু থেকে বলি। ওই দিন সাধারণ দিনের মতোই কর্মদিবস ছিল আমার। আমি আমার অফিসের শিফট ডিউটি শেষ করে আমার বাসায় ছিলাম। আমার একটি সোর্স আমাকে ফোন দিয়ে বলে, হ্যান্ডি দেশে কিছু অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটতে চলেছে। সৈন্যরা রাজপথ দখল করে নিচ্ছে। এর কয়েক মিনিট পর আমাদের আঙ্কারার নিউজ রুমের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ফোন দিয়ে আমাকে একই কথা জানান। আমি আমাদের মহাপরিচালকের সঙ্গে ফোনে এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলি।

এরপর আমার ফোনটিতে একাধিক ফোন আসতে থাকে বিভিন্ন সোর্স থেকে। অন্য একটি সোর্স আমাকে ফোনে জানায়, হ্যান্ডি সৈন্যরা ইস্তাম্বুলের পুলিশকে থামিয়ে দিয়ে তাদের বন্দুক কেড়ে নিয়েছে। নিউজ রুমে যান। আজকের রাতটি অদ্ভূত রাত। হোয়াটস অ্যাপের মাধ্যমে আমি আমার নিউজ রুমের স্টাফদের এসএমএস করে দ্রুত অফিসে আসতে বলি। আমি আমার সন্তানকে আমার মায়ের বাসায় রেখে আসি। বাসা থেকে আসার সময় আমি আমার সব সোর্সকে ফোন দিতে থাকি।

তাদের মধ্যে রাজনীতিবিদরা এই বিষয়ে আমাকে কিছুই জানাতে পারেনি। তবে নিরাপত্তা কয়েকজন সূত্র আমাকে অনেক তথ্য জানিয়েছিল। আমি যখন নিউজ রুমে প্রবেশ করি তখন টিভি স্ক্রিনে বসফোরাস ব্রিজের সৈন্যদের ফুটেজ দেখতে পাই। ক্যামেরার সামনে বসে আমি আঙ্কারার পরিস্থিতিতি নিয়ে আমাদের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলতে শুরু করি। আমরা সংগঠিত ছিলাম। প্রতিনিধিদের সহায়তায় আঙ্কারার পুরো পরিস্থিতি প্রচারের শীর্ষে ছিলাম আমরা। তবে তারপর মানুষের মধ্যে গোলাগুলি, বিমান থেকে বোমা বিস্ফোরণ, কপ্টারের মাধ্যমে গুলি বর্ষণ শুরু হলে আঙ্কারার সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। আমাদের নিউজ রুম প্রেসিডেন্টশিয়াল কমপ্লেক্সের পাশেই ছিল। প্রতিটি বোমের বিস্ফোরণে নিউজ রুম কেঁপে ওঠে। আমরা খুবই ভয় পাই। একদিকে আমি খুবই ¯œায়ুবিক চাপে ও ভীতিতে ছিলাম। অন্যদিকে আমার সোর্সের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখি। সোর্সদর মধ্যে প্রেসিডেন্সিয়াল অফিসাররাও ছিলেন।

ওই সময় প্রেসিডেন্ট এরদোগান মারমারিসে ছিলেন। আমি আলাদাভাবে তার দুইজন নির্বাহী সহকারীর সঙ্গে কথা বলি। তাদের মধ্যে একজন হচ্ছে হাসান দোগান। তিনি আমাকে জানান প্রেসিডেন্ট এরদোগান সাংবাদিকদের বিবৃতি দিতে যাচ্ছেন। আমি তার কথার সূত্র ধরে ব্রেকিং নিউজ করি চ্যানেলে। ব্রেকিং নিউজের এক ঘন্টা পরেও প্রেসিডেন্ট কোনো বিবৃতি দেয়নি। ওই সময় প্রেসিডেন্ট যে হোটেলে অবস্থান করছিলেন ওই হোটেলের উপরে দুইটি কপ্টার যে গুলি বর্ষণ ও বোমা নিক্ষেপ করছে তা আমাদের জানা ছিল না।

ব্রেকিং নিউজ দিলেও প্রেসিডেন্টের বিবৃতি না পেয়ে আমি পুনরায় হাসান দোগানের কাছে জানতে চাই প্রেসিডেন্ট এখনো বিবৃতি দেননি। উত্তরে হাসান দোগান জানান, পেরিসকোপের মাধ্যমে একটি বিবৃতি দিয়েছেন তবে এর কোনো কার্যকারিতা দেখা যাচ্ছে না বলে আমাকে জানান। সিএনএন তুর্কের জন্য নতুন করে বিবৃতি তৈরি করার জন্য আমি তাকে বলি।

সৈন্যদের আক্রমণের কারণে ক্যামেরা ও ব্রডকাস্টিংয়ের কোনো যন্ত্রপাতি বা কোনো গাড়িও ছিল না। তাই আমি তাকে ফোনের মাধ্যমে বিবৃতি তৈরি করার প্রস্তাব দেই। এরপর তিনি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেন। এরপর আমার কাছে জানতে চান স্কাইপে আছে কি না। পরে আমি তাকে ‘ফেইস টাইম’র মাধ্যমে কথা বলতে বলি। এরপর আমি দেখি ফোনের স্ক্রিনে প্রেসিডেন্টের চেহারা ভেসে ওঠে। আমি যে স্টুডিওর কক্ষে বসা ছিলাম সেখান থেকে চিৎকার করে বলতে থাকি প্রেসিডেন্ট ফোনে আছেন। শোনামাত্র সবাই খুশি হয়। প্রথমে আমার সঙ্গে সবাই হ্যান্ডশেক করে। আমি আমার দেশের এই পরিস্থিতি নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন ও উত্তেজিত ছিলাম। প্রেসিডেন্ট ফোনের স্ক্রিনে ছিলেন। এরপর আমি আমার ল্যাপেল মাইক্রোফোন নিয়ে তার সাক্ষাৎকার নিতে শুরু করি।

বিল্ড: সেনাদের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের জন্য ‘ফেইস টাইম’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে আপনি কি তাই বলবেন?
ফিরাত: অবশ্যই। ওই সময় এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। কারণ ওই সময় প্রেসিডেন্ট জীবিত না মৃত কেউ তাকে দেখাতে পারেনি বা তার সম্পর্কে বলতে পারেনি। আমার ফোনের মাধ্যমে সবাই প্রেসিডেন্টকে দেখেছে ও তার কথা শুনেছে। এছাড়া ফোনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট এরদোগানের গণতন্ত্র রক্ষার আহ্বানে দেশের পুরো চিত্র পরিবর্তন হয়ে যায়।

বিল্ড: আপনার ফেইস টাইমের সময় ব্যক্তিগত দুইবার ফোন আসে। আপনি কি কখনো ভেবেছেন আপনার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথনের সময় বাধাপ্রাপ্ত হবে?

ফিরাত: হ্যা ওইটি ছিল আমার জন্য অদ্ভুত ব্যাপার! কারণ ওই রাতে আমি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সবার আলোচনার ব্যক্তি ছিলাম। আমার ফোন কলের মাধ্যমে দেশের মানুষ প্রথম ব্রেকিং নিউজ পায়। দেশের পুরো চিত্র পরিবর্তন হয়। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথোপকথনের সময় প্রথমবার আমাকে কল করে আমার বান্ধুবী টুনা। প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে সে তার বাসায় টিভি দেখতে পারছিল না। এরপর আমি কোথায় আছি ঠিক আসি কিনা জানতে চায়।

বিল্ড: সবকিছু সম্পন্ন হওয়ার পরে আপনি কি টুনাকে অভিযোগ করেছেন?

ফিরাত: এরপর আমি তাকে ফোন দিয়ে বলি টুনা তুমি তো এখন থেকে বিখ্যাত একজন। এরপর বিখ্যাত হওয়ার জন্য আমাকে অন্য একজন ফোন করে। কারণ আমি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আইফোনে কথা বলার সময় তা সঙ্গে প্রচার হচ্ছিল। আমার মোবাইল স্ক্রিনে তার নাম ওঠার জন্য ফোন করেছিল।

বিল্ড: টেলিফোনে প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সঙ্গে কথা বলা শেষ হওয়ার পরে আপনার অনুভূতি কেমন লেগেছিল?

ফিরাত: ফোন শেষ করেই আমি পূনরায় আমার ১১ বছরের মেয়ে নিহিরের কাছে ফোন দেই। ওই রাতে আমি আমার মেয়ের সঙ্গে কয়েকবার ফোনে কথা বলেছি। নিহির সারারাত ভয়ে কেঁদেছিল। আমাকে বলছিল মা তুমি কখন আসবে? তুমি কি ঠিক আছো? কখন বোমা বিস্ফোরণের শব্দ শেষ হবে মা? সেনা অভ্যুত্থান মানে কি মা? তারা কি আমাদের সৈন্য না? আরো নানান ধরনের প্রশ্ন করছিল আমাকে।

তার শব্দগুলো আমাকে বেশ আক্রান্ত করেছিল। আমি যখন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলছিলাম তখন মিহিরের কথাগুলো আমার কানে বাজছিল। আমার মনেও প্রশ্নগুলো ওঠে আমরা কেন বর্তমান বিশ্বে এই পরিস্থিতির মোকাবেলা করছি? তারপর মনে করি সবকিছু স্বাভাবিক হবে। ওই রাতটি সত্যিই ভীতিতে কেটেছিল। যখন বোমা বিস্ফোরণ ও বিমান আমাদের মাথার উপর ছিল তখন আমি বিধাতাকে ডাকছিলাম। আমি, আমাদের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও টেকনিক্যাল শাখার দুইজন এক সঙ্গে আশ্রয় নিয়েছিলাম। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার জন্য আমি বিধাতার কাছে প্রার্থনা করেছিলাম।

বিল্ড: ফোনের মাধ্যমে কথা বলার কয়েক ঘন্টা পর অভ্যুত্থন সমর্থনকারী সৈন্যরা আপনাদের চ্যানেল ঘেরাও করে ফেলে। এরদোগানের সঙ্গে কথা বলার জন্য তারা আপনাকে কি শাস্তির কথা বলেছিল? তারা কি ফোনে কথা বলার জন্য আপনাকে কিছু বলেছিল?

ফিরাত: জেট বিমানের শব্দ শুনে আমরা আগে থেকেই কাঁদছিলাম। আমি জানি না তারা আঙ্কারার অফিসে এসেছিল কি না। আমি জানি না তারা আমার সস্পর্কে কিছু বলেছে কি না। আমি আমার কাজ করছিলাম। আমি একই কাজ করতাম যদি আবার তা হতো। আমি শুধু আমার মেয়েকে দেশ থেকে অন্য দেশে পাঠিয়ে দিতাম যেখানে শক্তিশালী গণতন্ত্র আছে। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র হচ্ছে বাতাস ও পানির মতো। এগুলো থাকতেই হবে।

বিল্ড: ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের পর আপনি কি এরদোগানের সঙ্গে কথা বলেছেন অথবা প্রেসিডেন্ট কি আপনাকে তার প্রেসিডেন্সি রক্ষার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন?

ফিরাত: না তার সঙ্গে কথা হয়নি। তবে দেশের অনেক মানুষ আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। শতশত ইমেল ও টুইট বার্তা পেয়েছি। অনেকে আমাকে ফুলের তোড়া পাঠিয়েছেন। এছাড়া দেশের বাইরে থেকেও আমি শুভেচ্ছা পাই। সৌদি আরব, মিসর ও কাতার থেকে শুভেচ্ছা আসে আমার কাছে।

সৌদি আরবের একজন ব্যবসায়ী আমার ফোনের জন্য আড়াই লাখ ডলার প্রস্তাব করে। টুইটারে অনেকে আমার ফোনের নাম রাখে ‘ফোন অব ফ্রিডম’। দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলের নেতারা আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। তবে কোন মুহুর্তটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল জানেন? যখন আমার মেয়ে আমাকে প্রশ্ন করে এটি শেষ হবে কি না জানতে চাইলে আমি বলি শেষ হবে। ওই মুহুর্তটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল আমার কাছে। আমি মনে করি ২০১৬’তে এসে সবাই গণতন্ত্র নিয়ে বাঁচাই উত্তম। গণতন্ত্র ছাড়া কোনো বিকল্প পথ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *