রোহিঙ্গাদের জাতিগত নিধন চলছে, বাংলাদেশকে আশ্রয় ও সুরক্ষা দেয়ার আহবান

Mujta-Rohinga-girlআমিনুর ইসলাম :সজাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন যে মিয়ানমারের সরকার সে দেশের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন অভিযান চালাচ্ছে।

বিবিসি বাংলার সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে কক্সবাজারে ইউএনএইচসিআর অফিসের প্রধান কর্মকর্তা জন ম্যাককিসিক বলছেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা পুরুষদের হত্যা করছে, শিশুদের জবাই করছে, নারীদের ধর্ষণ করছে, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ এবং লুঠতরাজ চালাচ্ছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো মিয়ানমারের জাতিগত নিধনের ব্যাপারে এতদিন ধরে যে অভিযোগ করে আসছিল, এবার জাতিসংঘও সেই অভিযোগ করছে।

তবে মিয়ানমার সরকার বলে থাকে যে রোহিঙ্গারা সে দেশের নাগরিক নয়। তাদের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগও মিয়ানমার অস্বীকার করে থাকে।

কক্সবাজারে বিবিসির আকবর হোসেনের সাথে সাক্ষাৎকারে ইউএনএইচসিআর কর্মকর্তা জন ম্যাককিসিক রাখাইন প্রদেশের মানবিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরের পরিস্থিতি বেশ গুরুতর। কিন্তু এই সমস্যার মূলে রয়েছে যে কারণ সেটি মিয়ানমারের ভেতরে।

তিনি বলেন, মূল সমস্যাটি হলো ৯ই অক্টোবর নয় জন সীমান্ত রক্ষীর হত্যার পর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের সমষ্টিগতভাবে শাস্তি দিচ্ছে।

তারা রোহিঙ্গা পুরুষদের হত্যা করছে, শিশুদের জবাই করছে, নারীদের ধর্ষণ করছে, বাড়িঘওে অগ্নিসংযোগ এবং লুঠতরাজ চালাচ্ছে। এর ফলে রোহিঙ্গারা নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে।

বিবিসির তরফ থেকে যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয় যে মিয়ানমারে সত্যিই জাতিগত নিধন চলছে কি না, এর জবাবে মি. ম্যাককিসিক বলেন, এ নিয়ে আপনারা যা জানেন আমরাও তাই জানি। আমরা টিভিতে যা দেখি এবং যেসব রোহিঙ্গা আসছে তাদের কাছ থেকে যা শুনি তাতে মনে হচ্ছে এই অভিযোগ সত্য।

“এরা সবাই বেসামরিক মানুষ। নারী ও শিশু। আমাদের কাছে তারা হত্যাকা-ের কথা বলছেন, তারা ধর্ষণের কথা বলছেন। তারা তাদের প্রিয়জনকে হারানোর কথা বলছেন।”

মি. ম্যাককিসিক জোর দিয়ে বলেন যে দেশে ফেরার পরিবেশ তৈরি হওয়ার আগ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের দেখাশোনার ব্যাপারে বাংলাদেশে একটা দায়িত্ব রয়েছে।

তিনি বলেন “এরা কিন্তু দেশে ফিরে যেতে চান। ফিরে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া আত্মীয়স্বজনকে খুঁজে বের করতে চান। কিন্তু তারা যতদিন বাংলাদেশে আছেন, ততদিন তাদের দেখাশোনা করতে হবে। তাদের জন্য খাবার এবং আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।”
শরণার্থী সমস্যায় আক্রান্ত বাংলাদেশের জন্য সমস্যার কথা স্বীকার করে নিয়ে তিনি বলেন, “এখন সীমান্ত খুলে দেয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের জন্য একথা বলা খুব কঠিন হবে যে সীমান্ত খুলে রাখা হবে। এতে করে মিয়ানমারের সরকারকে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতা অব্যাহত রাখতে উৎসাহিত করা হবে এবং তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য, অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের জাতিগত নিধনে উৎসাহিত করা হবে।”

“তবে এরপরও শরণার্থীদের আগমনের বিষয়টিকে মোকাবেলা করেতেই হবে। আশ্রয়দাতা দেশ হিসেবে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের প্রতি সদয় আচরণ করেছে। কিন্তু তাদের নিজেদেরই সম্পদ সীমিত … সরকার যে ব্যাপক সংখ্যায় রোহিঙ্গাদের পুশ ব্যাক করছে না, একে আমরা স্বাগত জানাই।”

মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সেনা অভিযানের মুখে বিপন্ন রোহিঙ্গাদের আরো নৌকা বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে ফেরত পাঠিয়েছে।

টেকনাফে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষা বাহিনী বিজিবি’র অধিনায়ক লে. কর্নেল আবুজার আল জাহিদ বিবিসিকে বলছেন, বৃহস্পতিবার ভোর চারটা থেকে ছয়টার মধ্যে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্ত বর্তী নাফ নদীতে যাত্রী বোঝাই সাতটা নৌকা অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে।

কিন্তু সীমান্তের চারটে পয়েন্টে এদের আটক করা হয় এবং নৌকাগুলোকে ফেরত পাঠানো হয় বলে তিনি জানান।
নৌকাগুলিতে শতাধিক রোহিঙ্গা নারী ও পুরুষ ছিল সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন।

অবশ্য টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দারা জানাছেন, বিজিবি’র কঠোর প্রহরা সত্ত্বেও সীমান্ত পথে প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে অনুপ্রবেশের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।

ওদিকে অর্থের বিনিময়ে অবৈধ পথে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পাচারের দায়ে টেকনাফের ভ্রাম্যমাণ আদালত আটজন দালালকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দিয়েছে।

টেকনাফ থানার ওসি আব্দুল মজিদ বিবিসিকে একথা নিশ্চিত করেছেন। গতকালও একই অভিযোগে কক্সবাজারের উখিয়াতে তিনজন দালালের সাজা হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের প্রতি সরকারের কঠোর মনোভাব সত্ত্বেও সীমান্তের ওপারে চরম সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে পড়া মানুষদের প্রতি বাংলাদেশিদের সহানুভূতি দৃশ্যত বাড়ছে।

তবে মিয়ানমারের সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের দাবি বরাবরই ‘অতিরঞ্জিত’ বলে বর্ণনা করে থাকে।

বর্মী সরকারের একজন মুখপাত্র য থে বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, আসলে রাখাইনে যা ঘটছে, তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা।
ওদিকে বাংলাদেশ সরকার বৃহস্পতিবার স্বীকার করেছে যে মানবিক কারণে তারা ইতোমধ্যে বেশ কিছু রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়েছে।

একই সাথে চলমান রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহবান জানিয়েছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধিদের সাথে এক বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রনালয় থেকে দেয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় মন্ত্রী বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের কাছে মিয়ানমারে নতুন সরকার আসার পর বাংলাদেশের সহযোগিতার বিস্তারিত বর্ণণা দিয়েছেন।

তিনি আশা করেছেন যে মিয়ানমারের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া তাদের নাগরিকরা ফেরত যেতে পারবে।

সংকট মোকাবেলায় সম্ভাব্য সব উপায়ে মিয়ানমারকে সহায়তার কথা বলা হয়েছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন এবং বলেছেন বিদেশী প্রতিনিধিরা সবাই যেন নিজ দেশকে অবহিত করে যাতে করে এ সংকটের সমাধানে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে।

এর আগে দুপুরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন মানবিক কারণেই কিছু রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছে।
যুক্তি হিসেবে তিনি বলেছেন যে সব লোকজন আটকানো বেশ কঠিন। আর কারও কারও মানবিক পরিস্থিতি এতো খারাপ যে তাদের ঢুকতে না দিয়ে পারা যায় না।

তিনি এও জানিয়েছেন যে বাংলাদেশে যারা অনুপ্রবেশ করছে তাদের খাবার ঔষধসহ প্রয়োাজনীয় মানবিক সহায়তা দেয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত মিও মিন্ট থানকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়।

মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সশস্ত্র বাহিনীর অব্যাহত অভিযানের কারণে পরিস্থিতির ক্রমশ অবনতি এবং বাংলাদেশের উপর তার প্রভাব নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বিপাক্ষিক এবং কনসুলার বিষয়ক সচিব কামরুল আহসান তার কাছে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

এদিকে মিয়ানমারে হত্যা-নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে আসা উদ্বাস্তুদেরকে আশ্রয় ও সুরক্ষা দেয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

গত বুধবার বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের সেদেশে ফেরত পাঠানো হবে বলে হুঁশিয়ারি দেয়ার পর এইচআরডব্লিউ ওই আহবান জানায়। মিয়ানমার সরকার ও চরমপন্থী বৌদ্ধরা রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর চরম নির্যাতন-নিপীড়ন চালাচ্ছে।

একদিন আগে বাংলাদেশী পুলিশ মিয়ানমার থেকে আসা ৭০ জন রোহিঙ্গাকে আটক করে। আটককৃতদের মধ্যে কয়েকটি শিশুও রয়েছে।

এক খবরে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে প্রায় পাঁচ’শ রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে এসেছে। এর ফলে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয় দেশে কড়া নিরাপত্তা সত্বেও সম্প্রতি বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা দুই হাজারে পৌঁছেছে বলে খবরে জানান হয়।
এইচআরডব্লিও একাধিকবার উপগ্রহ থেকে তোলা ছবি প্রকাশ করেছে যাতে দেখা যাচ্ছে মিয়ানমারে মুসলমানদের গ্রামের পর গ্রাম আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। চরমপন্থী বৌদ্ধরা মাসলমানদের ওপর হামলা করে তাদের হত্যা করছে। সেইসঙ্গে দেশটির সরকারও মুসলিম অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যে অবরোধ অবস্থা আরোপ করে রেখেছে। রাজ্যটিতে সরকারি বাহিনী ও উগ্রবাদী বৌদ্ধদের হাতে রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যা এবং নারীদের ধর্ষণ করার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুরা জানিয়েছেন মিযানমারের সৈন্যরা তাদের আত্মীয়-স্বজনকে হত্যা করেছে এবং বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি অন্তত দুই হাজার রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুকে বাঙলাদেশে ঢুকতে বাধা দিয়েছে। রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুরা বলছেন, মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো লোকেরা হত্যার শিকার হতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *