‘স্থুলতা’ বিশ্বে কয়েক মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু ডেকে আনবে ?

25D7508F00000578-2960508-image-a-51_1424369132340 রিবাতুল ইসলাম : নড়াচড়ার ক্ষমতা নেই স্টিফেন হকিংয়ের। তবে যে ক্ষমতায় তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন তা হলো ‘চিন্তা’। মহাজাগতিক বিভিন্ন রহস্য নিয়েই তার নিরন্তর ভাবনা। ভাবেন মানবজাতিকে নিয়েও। সে ভাবনা থেকেই এবার একটি ভিডিওতে মানবজাতির জন্য হুঁশিয়ারী বাক্য উচ্চারণ করলেন তিনি। সে হুঁশিয়ারীর বিষয়বস্তু হলো- ‘স্থুলতা’। স্টিফেন মনে করেন, মাত্রাতিরিক্ত খাওয়া এবং সে তুলনায় শারিরীক পরিশ্রম না করা মানবজাতিকে নিয়ে যাবে ধ্বংসের কিনারে।
স্টিফেন হকিং তার বক্তব্যে আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, ‘স্থুলতা’ পৃথিবীতে কয়েক মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু ডেকে আনবে।
তিনি বলেন, ‘বিশ্বে লাখ লাখ মানুষ মোটা হয়ে যাওয়ায় জীবন ঝুঁকিতে আছে। এ ধরনের স্থূলতা শুধু ক্যান্সার নয়, মৃত্যুর প্রধান কারণ হৃদরোগসহ অন্যান্য রোগও এর উপজাত।’

কৃষ্ণগহ্বর ধারণার প্রবক্তা স্টিফেন হকিং মনে করেন, ‘স্থুলতা’ই হতে যাচ্ছে একুশ শতকে মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা।’

বক্তব্যের এক জায়গায় তিনি বলেন, ‘আজকাল স্থুলতা এবং এ সংক্রান্ত রোগে ভোগে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।’

‘এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কি’? এমন প্রশ্নে স্টিফেন বলেন, ‘এর জন্য কোন রকেট সায়েন্সের প্রয়োজন নেই। তা হতে পারে খুব সহজ উপায়ে। আর তা হলো- কম খাও, বাড়াও শারিরীক পরিশ্রম।’

ভিডিওটিতে কিছু লেখাও ভেসে ওঠে। এসব লেখায় ছিলো- ‘শারীরিক অক্ষমতা এখন বিশ্বের ৪র্থ মৃত্যুর কারণ।’ ‘প্রাপ্তবয়ষ্কদের জন্য প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট শারীরিক অনুশীলন বাধ্যতামূলক আর শিশুদের ক্ষেত্রে তা হতে হবে অন্তত ১ ঘন্টা।’

নজর দেয়া যাক আমাদের দেশে। নিজের ওজন অতিরিক্তভাবে বৃদ্ধি ও তা কমাতে না পারায় ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে বেসরকারি চাকুরিজীবী রেবেকা সুলতানা তার সহকর্মী জান্নাতুল ফেরদৌসকে বলছিলেন, ‘আমি তো পরিশ্রম করি, হাঁটি প্রচুর, ভাত খাই মাত্র এ বেলা, সকালে খাই না, দুপুরে একটা রুটির সঙ্গে একটু সবজি খাই। কিন্তু ওজন তো কমাতে পারছি না। তিন মাসে ওজন বেড়ে গেছে ২০ কেজির মতো’।

জান্নাতুল ফেরদৌস বলছিলেন, ‘কী আর বলব, আমিও দেখছি, আমার ওজনও বাড়ছে। একমাসে ১০ কেজির মতো বেড়েছে। খাওয়া খুবই কমিয়ে দিয়েছি। রাতে এক ঘণ্টা হাঁটি, এটা নিয়ে খুব টেনশন হয়, আবার ডায়াবেটিস হয় কি-না’!
মঙ্গলবার ভর দুপুরে মহাখালী নিপসমের ক্যান্টিনে বসে আইসিডিডিআরবির এ দুজন নারী কর্মীর এমন কথোপকথন শোনা যায়।

শুধুমাত্র রেবেকা ও জান্নাতুলের মধ্যেই স্থুলতা, অতিস্থুলতা, অতিরিক্ত ওজন নিয়ে পারস্পারিক আলোচনা সীমাবদ্ধ নয়, এ প্রসঙ্গে কথাবার্তা প্রতিনিয়ত যেখানে-সেখানে চলে। স্বাস্থ্য বিষয়ে কথা বলতে গেলেই বেশিরভাগের মুখ থেকে শোনা যায়- স্থুলতা, অতিস্থুলতা ও অতিরিক্ত ওজন কমানো নিয়ে।article-2459012-18BC89CF00000578-830_306x291

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে- এই স্থুলতা ও অতিরিক্ত ওজনের ব্যক্তির সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। গোটা বিশ্বের অবস্থা একই। এজন্য বৃদ্ধি পাচ্ছে- ডায়াবেটিকস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ক্যান্সারসহ নানা অসংক্রামক ব্যাধি।

ধানমন্ডি সাতমসজিদ রোডস্থ ডায়মন্ড মাল্টি জিমের সত্বাধিকারী ও প্রধান প্রশিক্ষক দিলদার হোসেন দিলু বলেন, পরিশ্রমকে নিজের মতো করে ভাবলে হবে না। অনেকেই বলে থাকেন- তিনি প্রচুর হাঁটেন। এটা বলে বোঝাতে চান, তিনি প্রচুর পরিশ্রম করেন। কিন্তু এটা ঠিক নয়। হাঁটায় প্রয়োজনীয় পরিশ্রম হয় না। হাঁটায় ওজন কমবে না। ওজন কমাতে পারে কার্ডিয়াক ব্যয়াম, যেমন- সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা ইত্যাদি।

রোগতত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা কেন্দ্রের প্রাক্তন পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহমুদুর রহমান আমাদের সময় ডটকমের প্রশ্নে বলেন, হাঁটায় পরিশ্রম হয় ঠিকই। কিন্তু জোরে হাঁটতে হবে কমপক্ষে ১০মিনিট। এটা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা স্বীকৃত।

হাঁটা প্রসঙ্গে মাহমুদুর রহমান আরও বলেন, অনেকে ঘরেও হাঁটেন। কিন্তু এটা তো সঠিক পন্থার হাঁটার মধ্যে পড়ে না।
তিনি বলেন, কাজ করছি মানেই যে, পরিশ্রম করছি, তা ভাবার কোনো কারণ নেই। কাজে কাজে অনেক পার্থক্য আছে। ঘরে নারীরা সারাদিনই এটা-সেটা করছে। কিন্তু তাই বলে সেটা পরিশ্রম-কায়িক শ্রমের মধ্যে পড়ে না। ঘরোয়া কাজের মধ্যে সঠিক পরিশ্রমের সুযোগ আছে কি-না- প্রশ্নে তিনি বলেন, পাটায় মশলা পিষা, ঘরমোছা, সিঁড়ি দিয়ে উঠানামা করা যেতে পারে। তবে এসব কাজ অবশ্যই কমপক্ষে একটানা ১০মিনিট করতে হবে।

ডায়মন্ড মাল্টি জিমের সত্বাধিকারী ও প্রধান প্রশিক্ষক দিলদার হোসেন দিলু বলেন, অতিরিক্ত ওজন কমাতে শুধু খাবার কমিয়ে দিলেই হবে না। খেয়াল রাখতে হবে, খাদ্যের ৬টি উপাদানের মধ্যে যে উপাদান দেহের ওজন বাড়িয়ে দেয়, দেহে চর্বি বৃদ্ধি করে, সেসব খাওয়া হচ্ছে কি-না। এখন দেখা গেল- তিন বেলা ভাত খাওয়া বন্ধ করে দিলাম। কিন্তু আলু ভর্তা খাওয়া শুরু করলাম বা বৃদ্ধি করলাম, তাহলে কীভাবে হবে। এই আলুই তো চর্বি, ওজন বাড়াবে। সুতরাং খাবারের উপাদান সম্পর্কে, কোনটার কী কাজ জেনে সে অনুযায়ী খাদ্য গ্রহণ করা জরুরি।

রোগতত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা কেন্দ্রের প্রাক্তন পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, অতিরিক্ত ওজন, স্থুলতা, অতিস্থুলতা নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা আছে। কিন্তু খাবারের আইটেম বেশি থাকে ঘরে। না খেয়ে পারে না। এটা একটা সমস্যাই। এছাড়া মানুষ চায় ব্যয়াম করতে। কিন্তু সেভাবে জায়গা পায় না। হাঁটার জায়গা নেই। ফুটপাথের অবস্থা করুণ, রিকশার সংখ্যা খুবই বেশি। একসময় মানুষ ছোটখাট যাতায়াত হেঁটে করত, এখন সেটা করা হচ্ছে রিকশায় চেপে।

তিনি বলেন, ওজন কমাতে কায়িক পরিশ্রমের পাশাপাশি শর্করা, চর্বি জাতীয় খাদ্য গ্রহণ খুবই কমিয়ে বা বর্জনের দিকে যেতে হবে।

কাজ করার পর শরীরের কী দৃশ্যমান হলে বোঝা যাবে যে, পরিশ্রম করা হয়েছে- জানতে চাইলে ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, শরীর ঘামবে, ক্লান্ত অনুভব হবে, দুর্বল লাগবে। কেউ কেউ বসে থাকলেও কিন্তু ঘামে, ক্লান্ত অনুভব বা দুর্বল বোধ করে। এটা ভিন্ন বিষয়। এটা কোনো দৈহিক পরিশ্রম থেকে নয়, এটা হরমোনজনিত সমস্যা বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা থেকে হতে পারে।

অনেকটা একই ধরণের কথা বলেন, ডায়মন্ড মাল্টি জিমের সত্বাধিকারী ও প্রধান প্রশিক্ষক দিলদার হোসেন দিলু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *