ইরানের শিল্প ও সংস্কৃতি

  ইরানের শিল্প নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমে এসে যায় দেশটির কার্পেট শিল্পের কথা। পশ্চিমা বিশ্বে ইরানের শিল্প হিসেবে দেশটিতে হাতে কার্পেট তৈরির বুনন শৈলী ও এর গুণগত মান নিয়ে বেশ কদর রয়েছে। রয়েছে এর উচ্চ মূল্য। শত শত বছর ধরে ইরানে যে কার্পেট শিল্প গড়ে উঠেছে তাতে রয়েছে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অসাধারণ রঙ্গীন মিশেল। কার্পেটের বুননের পরতে পরতে রয়েছে ইরানি নারী ও পুরুষের লোকগাঁথা থেকে শুরু করে যুদ্ধ, বিগ্রহ, সাহিত্য সংস্কৃতির আভাস আর রংয়ের খেলা। ইরানের এ কার্পেট শিল্পের সঙ্গে আর কোনো দেশের সঙ্গে জুড়ি মেলা ভার। এ এক ইরানের নিজস্ব ও একান্তই শিল্প যেন। প্যারিসের লুভ্যের মিউজিয়ামে নবম শতাব্দীর এক পাথরের ভাস্কর্যে দেখা যায় পারস্যের এক নারীকে কার্পেট বুননে ব্যস্ত।

প্রাচীন সেই কার্পেট যা আজ পাজিরিক হিসেবে পরিচিতি, তা ৫০০ বিসি’তে সাইবেরিয়া অঞ্চলে বরফে চাপা পড়া সিদিআর প্রধানদের সমাধি থেকে উদ্ধার করা এক নমুনায় পাওযা যায়। ইরানের খুব কাছের কার্পেট বুননের ইতিহাস নিয়েও যদি কথা বলতে হয় তাহলে বলতে হয়, চীনের ইতিহাস থেকেও জানা গেছে ইরানে সাসানিদের আমলে কার্পেট শিল্পের ঐতিহ্যবাহী অস্তিত্ব ছিল। আরব ঐতিহাসিকরা বলছেন যখন ৬৩৭ সালে মুসলিম আরবরা সাসানিদের রাজধানী সিটিয়েসেফু জয় করে নেন তখন তারা সেখানে কার্পেট শিল্প দেখে মুগ্ধ হয়ে পড়েন। বাহরেস্তান বা বসন্তের বাগান নামে পরিচিত অসাধারণ কারুকাজ খচিত কার্পেট তাদের সংগ্রহের মধ্যে ছিল অন্যতম। কার্পেটে বাগানের ফুল ও পাতা ঝড়ে পড়া শুধু নয়, ধাবমান শিকারি ঘোড়ায় চড়ে হরিণ শিকার বা নানা ধরনের চিত্র কার্পেটে অসাধারণ বুনন শৈলীতে জীবন্ত হয়ে ওঠে। শুধু কি তাই, স্বর্ণের সুতার ব্যবহার, মনিমুক্তার বিধুনি ও অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন অংশে বিভক্ত এধরনের কার্পেট পৃথকভাবে ক্রয়বিক্রয় হত। বাদশাহী প্রাসাদে বা গুরুত্বপূর্ণ হলরুমগুলোতে এসব কার্পেট শোভা বর্ধন করত।

ইসলামি বিশ্বে প্রথম ইরানের কার্পেট শিল্পের পরিচয় পাওয়া যায় সেলজুক তুর্কিদের শাসনামলে। তুর্কি বুননে কার্পেটের গিট তৈরি পদ্ধতি আজো ইরানে অনুসরণ হচ্ছে। এসব গিটের আলাদা আলাদা রীতি ও কৌশল রয়েছে। ইরানের হামেদান ও আজারবাইজানে এখনো কার্পেট শিল্পে সেলজুক প্রভাব বেশ শক্তিশালী হয়েই টিকে আছে। ১১ ও ১৩ শতাব্দীর কার্পেট বুননের পরিচয় আজো সেসব অঞ্চলের কার্পেট দোকানে গিয়ে দেখতে পেয়ে হতবাক হয়ে যেতে হয়। তারও আগে ১০ম শতাব্দীতে ফারস অঞ্চলে এক ধরনের ছোট আকারের কার্পেট ‘জিলু’ তৈরি হত যা আসলে জায়নামাজের মতই দেখতে ছিল। আরেক ধরনের কার্পেটের নাম ছিল ‘কিলিমস’। ফাসা, দারাবগের্দ, জাহরমে কার্পেট তৈরি হত নানা প্রকারের। এসব কার্পেটের কোনটি পরিচিতি পায় জাহরোমি নামে। কার্পেটে এমব্রয়ডারির ব্যবহার ছিল দেখার মত।

এরপর গাজান খান ইলখান তার রাজধানী সিরাজে কার্পেট শিল্পকে নিয়ে যান আরেক উচ্চতায়। এসব কার্পেট আকারে ছিল বেশ বড়। সারাবিশ্বে এধরনের অন্তত ১৫’শ কার্পেটের নমুনা এখনো সেরা সেরা যাদুঘর কিংবা ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত রয়েছে। এরপর নোমাদিক উপজাতিদের কার্পেট বুনন শিল্পের ঐতিহ্য আরো বৈচিত্রকরণ লাভ করে। রাজকীয় শিল্পে উত্তরণ ঘটে কার্পেট খাতের। মেঝেকে ঠান্ডা ও স্যাঁতসেঁতে ভাব থেকে রক্ষায় কার্পেটের ব্যবহার ছিল প্রায় অপরিহার্য। রাজদরবার থেকে শুরু করে জ্ঞানীগুণীরা কার্পেটকে মহামূল্যবান মনে করতেন। সম্পদ, মর্যাদা হিসেবে কার্পেটের কদর ছিল তাদের কাছে অপরিসীম। বেশিরভাগ সাফাবি শাসকরা কার্পেট শিল্পের প্রতি ব্যক্তিগত মনোযোগ রাখতেন। তদারকি করতেন। কার্পেট শিল্পের কলাকুশলী, কাঁচামাল উৎপাদক থেকে শুরু করে রং শিল্প সহ নানাদিকে তাদের নজর ছিল শুধু সখের বশে তা নয়, বরং তা যথাযথ গুরুত্ব পেত। কেউ কোনো নতুন ধরনের কার্পেট তৈরি করতে পারলে তা দেখা হতে সৃষ্টিকর্ম হিসেবে এবং এজন্যে প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার প্রাপ্তি ছিল বেশ দক্ষতা ও দরদে ভরা। ১৫৩৯ সালে দুটি পরিচিত কার্পেটের সন্ধান মেলে শেখ সাফি আল-দিন আরদেবিলির দরগায়। কোপেনহেগেনের রোজেনবার্গ দুর্গে এখনো একটি ইরানি কার্পেট শোভা পাচ্ছে যাতে স্বর্ণ ও রুপার সুতার মিশ্রণে কারুকাজ খচিত নকশা দেখে দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে যান।

এমনকি কাজার শাসনামলে কার্পেটে বেশ উজ্জ্বল রং ব্যবহার হতে থাকে। এখনো অন্যতম কুটিরশিল্প হিসেবেও কার্পেট শিল্প ইরানে মর্যাদা পেয়ে আসছে। নকশা বা আকারে ভিন্নতা ও গুণগত মান পার্সিয়ান কার্পেটেই খুঁজে ফেরেন সারা বিশ্বের কার্পেট প্রেমিরা। তেলের পর এখনো কার্পেট ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি পণ্যের স্থান দখল করে রেখেছে।

কার্পেট তৈরির প্রধান উপাদান হচ্ছে উল। হামেদান ও কুর্দিস্তানে উটের লোম কার্পেট তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। তবে সিল্কের ব্যবহার কার্পেটে এমন এক মানানসই উচ্চতায় নিয়ে গেছে যে ক্রেতারা বিমোহিত না হয়ে পারেন না। তবে উলের ব্যবহার হয় এর বাহারি রংয়ের জন্যে। ভেজিটেবল, প্রাণিজ রং দীর্ঘদিন ধরে কার্পেট তৈরিতে ঐতিহ্য হিসেবে বহাল থাকলেও ১৯ শতাব্দী থেকে শুরু হয় কেমিক্যাল রংয়ের ব্যবহার। কাঠের বা ধাতব লুমে প্রচন্ড জোরে চাপ দিয়ে কার্পেট তৈরিতে মুন্সিয়ানা ব্যবহার করেন বুনন শিল্পীরা। কার্পেটের গিট’এর প্রকারভেদ আছে। একটি হচ্ছে তুর্কি গিট. আরেকটি পারস্য গিট। তুর্কি গিট খুব শক্তিশালী ও ঠাসা। দুটি সারি সুতাকে পাশাপাশি আবদ্ধ করে রাখে দুটি তুর্কি গিট। কিন্তু পারস্য গিট দেওয়া হয় হাতে। প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে ৬৫ থেকে ৩৩০টি এধরনের গিট দিয়ে কার্পেটের বুনন এগিয়ে যায় যা সময় সাপেক্ষ ও অসীম ধৈর্যের বিষয়।

সাধারণত ইরানি কার্পেট আয়তকার হয়ে থাকে। গোলাকার হয় তবে তা খুব কম। আকারে বেশ বড় হয় এসব কার্পেট। কার্পেট তৈরির শুরুতে কাগজে নকশা এঁকে নেন শিল্পীরা। নকশায় মার্জিন টানা হয় তিন ভাগে। এসব নকশায় থাকে কাব্যিক ভাব। বেহেশতের বাগান থেকে শুরু করে অপূর্ব সব ধারণা মন দখল করে রাখে কার্পেট শিল্পীদের। মাছ, ফুলদানি, চারটি ঋতুর প্রতিচ্ছবি, জীবজন্তু, পাখি, জ্যামিতিক, ফুলের বাহার, লতাগুল্মের আনাগোনা, বিভিন্ন চিত্রের কারুকাজ সারা কার্পেট জুড়ে জানান দেয় শিল্পীদের মন ও মানসের প্রেমময় মনস্তাত্ত্বিক ভাবধারা। রংয়ের দিক থেকে গাঢ় লাল, সোনালী বাহার কিংবা ঘন নীল প্রাধান্য পায় কার্পেট তৈরিতে। কেরমানে তৈরি কার্পেটগুলো এ তিনটি রং ব্যবহারে এগিয়ে। ইস্ফাহান ও কাসানও কম যায় না এধরনের কার্পেট তৈরিতে।

কার্পেট তৈরি নিয়ে ইরানের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে বুনন কেন্দ্র। কাসান, ইয়াজদ, ইস্ফাহান, তাব্রিজ, কেরমান, জোশাকান, হামেদান, সানানদাজ কত নাম বলা যায়! ডসরাজে আবার উপজাতীয় শিল্পীরা কার্পেট তৈরিতে জড়িত। তেহরানে রয়েছে কার্পেট যাদুঘর।

এছাড়া বস্ত্র শিল্পের ইতিহাস কিন্তু ইরানে হাজার বছরেরও বেশি। সাসানীয় থেকে ইসলামী শাসকদের আমল পর্যন্ত এমনকি তারপরও যুগ যুগ ধরে বস্ত্র শিল্প চলে এসেছে নির্বিঘেœ। সপ্তম থেকে ১৩’শ শতাব্দী টানা বস্ত্র শিল্পের জয়জয়কার। খুজেস্তান, সুসা, সুসাসতার, গন্দেশপুর এলাকাগুলো ছিল অসাধারণ সব বস্ত্র নৈপুন্যে ভরপুর। সুসাসতার থেকে দীর্ঘদিন কাবার গিলাফ তৈরি হয়ে যেত। খোরাসান, নিশাপুর, মার্ভ এবং হেরাত যেমন উচ্চমানের তুলা উৎপাদন করত তেমনি বস্ত্রও ছিল উন্নত। সুতি থেকে শুরু করে উল, লিনেন ও বিভিন্ন রকমের সিল্ক উৎপাদন হত। আরো উত্তরে সোঘদিয়ানা, খারাজম, বুখারা, সমরখন্দ’এর মত এলাকাগুলোতে মিসরের মতই উন্নত বস্ত্রের জন্যে খ্যাতি ছিল। পারস্যের মধ্যাঞ্চলে রায় ও ইস্ফাহানে মুনায়ার নামে এক বিশেষ ধরনের কাপড়ের কদর ছিল। চীনের অনুসরণে সোনালী তন্তুর একপ্রকারের কাপড়ের নাম ছিল কিমখা। এসব শিল্পের পৃষ্ঠপোষক যে শুধু পারস্যের স¤্রাটরা ছিলেন তা নয়, সমঝদার হিসেবে ইসলামি শাসকদের বাণিজ্যের প্রতি দারুণ আগ্রহ থাকায় বস্ত্র শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটে অভাবিতভাবেই।

কিন্তু মঙ্গলদের আগ্রাসনে এসব বস্ত্র শিল্পের প্রভূত ক্ষতিসাধন হয়। সুসা এলাকায় বস্ত্র শিল্পের অপুরণীয় ক্ষতি হয়। গন্দেশপুর, রায়, মার্ভ এলাকাগুলোর বস্ত্র শিল্প যে শুধু ধংস হয় তা নয়, একই সঙ্গে বস্ত্র শিল্পের সঙ্গে জড়িত শিল্পী, কারিগর এসব এলাকা ছেড়ে নিশাপুর ও হেরাত অঞ্চলে চলে যেতে বাধ্য হয়। এর পলে তাব্রিজে নতুন করে বাণিজ্য কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়।

প্রাচীন পারস্যের শিল্প ঐতিহ্য

প্রাচীন সভ্যতার মধ্যে মিশরীয়, গ্রীক এবং রোমান সভ্যতা যেমন উল্লেখযোগ্য, তেমনি উল্লেখযোগ্য হচ্ছে প্রাচীন পারসিক সাম্রাজ্য। পুরাতন পৃথিবীতে ইরানীয় মালভূমিতে যে পারসিকরা বসতি করত তারা অনন্যসাধারণ স্থাপত্যকর্মের নিদর্শন রেখে গেছে। এক সময় সভ্যতার রঙ্গমঞ্চে ফেরাউনের প্রতাপ ছিল। তারপরে এল নিনেভা এবং ব্যাবিলনের রাজাদের প্রতাপ। এরপরই আমরা ইরানে একিমিনীয় সাম্রাজ্যের সন্ধান পাই। একিমিনীয় সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব ছিল দীর্ঘকাল। এই সাম্রাজ্য যে বলিষ্ঠ সংস্কৃতিকে বহন করত সেই সংস্কৃতির নিদর্শনস্বরূপ আমরা প্রাচীন পারস্যে অনেক দুর্গ ও প্রাসাদের নিদর্শন পাই। এই দুর্গ ও প্রাসাদের নিদর্শন থেকে নির্ণয় করতে অসুবিধা হয় না যে, প্রাচীন পারস্যের এই সভ্যতায় বিত্তের অধিকার এবং প্রতাপ ছিল প্রচ-। এর প্রমাণ আমরা পাই বহু বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে তাদের ধ্বংসাবশেষের চিহ্নের মধ্যে। মূলত সাতটি সভ্যতার এক ঘুরপাক বা মিলনস্রোথ এসে যেন থিতু ঘটে ইরানে।

ইরানের অভ্যুদয় কখন হয় তা আমরা সুস্পষ্টভাবে জানি না। গবেষকগণ অনুমান করেন যে, ‘আরিয়ান’ শব্দটি থেকেই ইরান শব্দের উদ্ভব ঘটেছে। যার অর্থ হচ্ছে আর্য জাতির বসতভূমি। ‘পারস্য’ শব্দটিও প্রাচীন। এ শব্দটি এসেছে গ্রীক ‘পারসিস’ শব্দ থেকে। ‘পারসিস’ শব্দের অর্থ ফারস প্রদেশ। প্রাচীন যে একিমিনীয় রাজশক্তির উদ্ভব ইরানে ঘটেছিল তাদের উদ্ভব হয়েছিল ফারস প্রদেশ থেকেই। একিমিনীয় রাজ্যের রাজধানী ফারস্ প্রদেশে বলেই বর্তমান পারস্য শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহার হয়। প্রাচীন পারস্যে মিদ এবং পারসিক- এ দু’টি সম্প্রদায় ছিল আর্য সম্প্রদায়। মিদ সভ্যতাও একটি প্রাচীন সভ্যতা যা পরে পারসিস সভ্যতার সঙ্গে মিশে যায়। মিদ সভ্যতার সঙ্গে অ্যাসিরিয় এবং সিথীয় সভ্যতার সম্পর্ক ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ১১০০ অব্দের অ্যাসিরীয় শিলালিপিতে মিদ সম্প্রদায়ের উল্লেখ আছে। এরা ছিল পারস্যের পশ্চিমাঞ্চলের অধিবাসী এবং দীর্ঘকাল এরা অ্যাসিরীয়দের শাসনাধীনে ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ অব্দে এরা স্বাধীনতা অর্জন করে। দক্ষিণ পারস্যের অধিপতি কাইরাস খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ অব্দে মিদ সম্প্রদায়কে পরাভূত করে নিজের সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান। তিনি লিদিয়ার রাজা ক্রিসাসকেও পরাজিত করেন এবং সর্বশেষ পর্যায়ে ব্যাবিলনও তার বশ্যতা স্বীকার করে। এ ঘটনাটি ঘটে খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৮ অব্দে। এভাবে ব্যাবিলন এবং মিদীয় সাম্রাজ্য অধিকার করে কাইরাস যে বিরাট সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন তা বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে একিমিনীয় সাম্রাজ্য নামে চিহ্নিত। যেহেতু এই সাম্রাজ্যের সম্রাটদের পূর্বপরুষদের একজনের নাম ছিল একিমিনীয় সেই কারণে কাইরাসের সাম্রাজ্য একিমিনীয় সাম্রাজ্য বলে খ্যাতি পেয়েছে। কাইরাসের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্রের রাজত্বকালে একিমিনীয় সাম্রাজ্য মিশর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

পার্সিপোলিসের দীর্ঘ কলামগুলোর পাশে মানুষ যদি দাঁড়ায় তাহলে মানুষগুলোকে ক্ষুদ্রাকায় বামনের মতো দেখাবে। এই প্রাসাদ ছিল মানুষের স্বাভাবিক পরিমাপবোধের বাইরে। পৃথিবীর কোন সভ্যতায়ই এত বিরাট এবং বিপুলায়তনের চিহ্ন আমরা খুঁজে পাই না। এই রাজপ্রাসাদটি নির্মাণ করা হয়েছিল পাহাড়ের সানুদেশে এবং সে যুগের স্থপতিরা পাহাড়ের মহিমাময় এবং বলিষ্ঠ ব্যঞ্জনার প্রেক্ষাপটে রাজপ্রাসাদটি নির্মাণ করেছিলেন একটি অপরূপ দৃশ্যমান সঙ্গতিতে। আমরা দেখেছি যে, স্থাপত্যশিল্পে কলাম বা স্তম্ভ প্রাচীনকালে প্রাধান্য পেয়েছিল।

পারসিকদের শিল্পে আমরা প্রথম ঘোড়সওয়ারের মূর্তি দেখি। পরবর্তীকালে খ্রিস্টজগতের বিভিন্ন আইকনে ঘোড়সওয়ারের মূর্তি আমরা দেখতে পাই। এটা পারসিকদেরই দান। পাপ এবং পুণ্যের মধ্যে এভাবে ঘোড়সওয়ার মূর্তিকে ব্যবহার করা হয়েছে। ঘোড়সওয়ার বর্শার সাহায্যে বিরোধী শক্তিকে দমন করছে এই দৃশ্য পার্সিপোলিসে দেখা যায়। শিল্পসৌকর্য এবং দক্ষতার বিচারে আক্রমণরত ঘোড়সওয়ারের মূর্তিটি বিশিষ্ট শিল্প কৌশলের প্রমাণ বহন করে। ঘোড়ার গ্রীবাভক্তি এবং অশ্বপৃষ্ঠে অশ্বারোহীর আনত ভঙ্গি দু’টির মধ্য দিয়েই দক্ষ শিল্প কুশলতার পরিচয় পাওয়া যায়।

পারসিকদের অন্য একটি প্রাচীন নগরী হচ্ছে সূসা। সূসা নগরীর অবস্থিতি এমন একটি পটভূমিতে ছিল যেখানে কোন পাথর ছিল না। এর ফলে সেখানকার বাড়িঘর ছিল পোড়ামাটির ইটের এবং উৎকীর্ণ মূর্তিও ছিল পোড়ামাটির। এখানে আমরা রং এর ব্যবহার পাই। রং এর সাহায্যে মূর্তিতে চকচকে ভাব আনা হয়েছে। নানাবিধ রং এর ব্যবহার তারা করেছিল। তাদের উৎকীর্ণ মূর্তিতে আমরা অদ্ভুত আকৃতির নানা ধরনের জীবজন্তুকে পাই এবং তীর নিক্ষেপরত ধনুকধারীকে পাই। তাছাড়া নানা আকৃতির পাখাযুক্ত মূর্তিকে পাই।

ইসলামী শিল্পকলা

‘ইরান সর্বদাই চেষ্টা করেছে তার জাতীয় স্বকীয়তা নির্মাণকর্মের মধ্যে প্রস্ফুটিত করতে। এই স্বকীয়তাএসেছে তার অতীত থেকে। যে অতীতের ধর্মীয় চেতনাকে সে অস্বীকার করেছে, কিন্তু তার নির্মাণশিল্পকে গ্রহণ করেছে এবং সম্মান করেছে।’

৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে আরব অশ্বারোহীরা পূর্ণ বিক্রমে সাসানীয় সাম্রাজ্য আক্রমণ করল এবং ইরানের সমগ্র মালভূমি তাদের অধিকারে আনল। এক সময় মহামতি আলেকজান্ডরের হাতে একিমিনীয় সাম্রাজ্য পরাভূত হয়েছিল, তেমনি আরবদের হাতে সাসানীয় শক্তি নিশ্চিহ্ন হলো। দেশের দখল বিদেশীদের হাতে চলে গেল, কিন্তু তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধ্বংস হতে দিল না। ইসলামের বিজয়ের প্রাথমিক দিকে আরবরা ইরানে মসজিদ শিল্পের প্রতিষ্ঠা ঘটায়। উমাইয়াদের সময় যে ধরনের মসজিদ তৈরি হতো অবিকল সেই ধরনের মসজিদ ইরানে তৈরি হতে লাগল। উমাইয়া মসজিদের বিশেষত্ব ছিল যে, সেখানে একটি বিরাট অঙ্গনের চতুর্দিকে পোর্টিকোর ব্যবস্থা ছিল এবং নামাজের জন্য একটি আবরিত কক্ষের ব্যবস্থা ছিল। অতি অল্প সময়ের মধ্যে তারা নিজস্ব পদ্ধতিতে মসজিদ নির্মাণের সূত্রপাত ঘটাতে লাগল। ইরান তার অতীতের স্থাপত্যের নিদর্শন থেকে অনেক উপমা এবং ভাষা গ্রহণ করল। স্থাপত্যের ভাষায় যাকে ‘কীয়স্ক’ বলে প্রাচীন অগ্নিপূজার বেদীর থেকে তার নির্মাণকৌশল গ্রহণ করল এবং সাসানীয় যুগের অর্ডিয়েন্স হলকে ইসলামের প্রয়োজনে রূপান্তরিত করল। এই সংযোগটি রাজপ্রাসাদ-মসজিদ এবং মাদ্রাসার মধ্যে একটি সেতু-বন্ধন নির্মাণ করল। ইরানীয় রাজপ্রাসাদের এবং পরবর্তীকালে মাদ্রাসার মাঝখানে একটি চতুষ্কৌণিক কোড থাকত যার চতুর্দিকের অভ্যন্তরীণ দেয়ালে আইভান বা অর্ডিয়েন্স হলগুলো থাকত। একে অনেকটা ক্রুশাকার বা ‘ক্রুশিফর্ম প্ল্যান’ বলা হয়ে থাকে। ইরানীয়রা অতীতের পদ্ধতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে সমর্থ হয়। মসজিদের মধ্যে কেবলা নির্দিষ্ট হয় এবং একটি ‘নিশ’ এর আকারে মেহরাব সংযুক্ত হয়। এক প্রকার বক্র খিলানের মধ্যে মেহরাব প্রতিষ্ঠিত হয়। ইরানীয় মসজিদ-স্থাপত্যে ভোল্ট এর ব্যবহার অনন্যসাধারণ। অনেক প্রকার খিলানের পারস্পরিক সংযোগে বিরাট খিলানের ভোল্ট-এর সৃষ্টি তারা করেছিল।

ইরান সর্বদাই চেষ্টা করেছে তার জাতীয় স্বকীয়তা নির্মাণকর্মের মধ্যে প্রস্ফুটিত করতে। এই স্বকীয়তা এসেছে তার অতীত থেকে। যে অতীতের ধর্মীয় চেতনাকে যে অস্বীকার করেছে, কিন্তু তার নির্মাণশিল্পকে গ্রহণ করেছে এবং সম্মান করেছে। অতীতের এই নির্মাণশৈলীর বৈশিষ্ট্য ছিল তার অগ্নিপূজার বেদীভূমির কৌশলগত নির্মাণ, সাসানীয় সাম্রাজ্যের অর্ডিয়েন্স হল এবং গম্বুজ শিল্প। ইরান ইসলামী শিল্পকলার ক্ষেত্রে নতুন ভঙ্গিতে এবং নতুন ভাষায় প্রাচীনকালের নির্মাণ পদ্ধতিকে গ্রহণ করেছে। আমরা লক্ষ্য করি যে, ইসলামী স্থাপত্যের ক্ষেত্রে ইরান গম্বুজকে নানাভাবে ব্যবহার করেছে এবং বহু খিলানের সমন্বিতরূপে ভোল্টের ব্যবহারকে প্রবল করেছে। ইরানকে অন্য কোন দেশ থেকে গম্বুজের কলাকৌশল গ্রহণ করতে হয়নি। ইটের তৈরি গম্বুজ ইরানে পূর্বেও ছিল, এমনকি বাসগৃহেও ছিল। ইতিহাস বলে, প্রার্থীয় এবং সাসানীয় সাম্রাজ্যের সময় গম্বুজের ব্যবহার নানাভাবে বিস্তৃত হয়। রাজপ্রাসাদ এবং মন্দিরের চূড়ায় গম্বুজের ব্যবহার ছিল। ইসলামের আগমনের পর ইরানের মুসলমান স্থপতিরা গম্বুজ এবং ভোল্টের ব্যবহার নতুনভাবে বিশুদ্ধ করেছে এবং এসব ক্ষেত্রে অসাধারণ উৎকর্ষ লাভ করেছে। পূর্বেকার গম্বুজগুলো চতুষ্কৌণিক ভিত্তির ওপর নির্মিত হতো। ইসলামের আগমনের পরে এই চতুষ্কৌণিক ভিত্তি বৃত্তাকারে পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তন সাধনের ফলে গম্বুজের যেমন দৃশ্যগত পরিবর্তন সাধিত হয়, তেমনি নির্মাণগত পরিবর্তন সাধিত হয়। ইরানের শিল্পীরা জ্যামিতিক সূক্ষ্ম বিচারের সাহায্যে তাদের গম্বুজ, খিলান এবং ভোল্টের উৎকর্ষ সাধন করেছিলেন। আমরা জানি, তাঁরা জ্যামিতিক কৌশলে বৃত্ত, অর্ধ বৃত্ত, চতুষ্কোণ এবং বহুবিধ কৌণিক ব্যঞ্জনা অট্টালিকার নির্মিতির মধ্যে অসাধারণ বৈচিত্র্য সম্পাদন করেন। প্রাচীন গ্রীকরাও জ্যামিতিকে গ্রহণ করেছিল, কিন্তু তারা জ্যামিতির সাহায্যে বৈচিত্র্য সৃষ্টিতে সক্ষম হয়নি। তারা ত্রিভুজের ব্যবহার করেছে এবং লম্ব রেখার ব্যবহার করেছে। ইরানের মুসলমান শিল্পীরা এ দু’টি ব্যবহারে সন্তুষ্ট থাকেননি। তাঁরা সমান্তরাল রেখা, লম্বরেখা, বৃত্ত, অর্ধবৃত্ত, বক্ররেখা এবং নানাবিধ আকৃতি নিয়ে বিস্ময়কর পরীক্ষা করেছেন। এসব পরীক্ষার ফলস্বরূপ যে শিল্পস্বভাবের পরিস্ফুটন দেখি তা অতুলনীয়।

ইরানের ইসলামী শিল্পকে যদি আমাদের পরীক্ষা করতে হয়, তাহলে ইস্ফাহান শহরের দিকে আমাদের দৃষ্টিপাত করতে হবে। শহরটি একটি পরিকল্পিত শহর ছিল এবং এ শহরের মসজিদ পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে নগরের চতুর্দিকে বিস্তৃতি ঘটেছিল। একাদশ শতক থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত এ নগরের স্থাপত্যগত বিকাশ ঘটে। সেলজুকদের আমলে এবং সাফাভীদের আমলে শহরটি ছিল ইরানের রাজধানী। শহরের প্রধান মসজিদই হচ্ছে ‘মসজিদ-ই-জামি’। সেলজুকদের আমলে এই মসজিদটি নির্মিত হয়। মালিক যখন সম্রাট, তখন ১০৭৩ থেকে ১০৯২ সালের মধ্যে এই মসজিদটি নির্মিত হয়। যথার্থ ইরানীয় পদ্ধতিতে এই মসজিদটি নির্মিত হয়। সাফাভীদের আমলে ১৫৫৮ খ্রিস্টাব্দে ইসফাহান যখন পুনরায় ইরানের রাজধানীতে পরিণত হয় তখন সম্রাট শাহ আব্বাস শহরটিকে স্থাপত্যকলার দিক থেকে নতুন করে পুনর্গঠিত করেন। তিনি ‘মায়দান-ই-শাহ’ নামক একটি বিরাট রাজকীয় কমপ্লেক্স নির্মাণ করেন। উক্ত কমপ্লেক্সে চল্লিশটি কলাম বা পিলারের ওপর একটি প্রাসাদ নির্মিত হয় এবং ‘আলী কাপু’ নামক অন্য একটি প্রাসাদ ময়দানের নিকটে নির্মিত হয়। এই কমপ্লেক্সে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ছিল শেখ লুৎফুতউল্লাহ মসজিদ। অন্য একটি মসজিদ ছিল যাকে ‘শাহের মসজিদ’ বলা হতো। এই ‘শাহের মসজিদ’ হচ্ছে ইরানের একটি অনন্যসাধারণ স্থাপত্য কীর্তি। এই মসজিদের মধ্যে একটি চতুষ্কৌণিক আয়তক্ষেত্র ছিল যার চারপাশে ভোল্ট আকৃতির ৪টি মেহরাবের মতো নির্মিতি ছিল।

ইরানের মসজিদ নির্মাণ রীতিতে একটি গম্বুজকে মাঝখানে কেটে দু’খ- করলে যে অর্ধবলয় নির্মিত হয় যা আইভান হিসেবে পরিচিত এবং তা এমনভাবে গঠিত যে, দর্শকের জন্য তা বিস্ময়-বিমূঢ়তার সৃষ্টি করে। এই অর্ধগম্বুজ নির্মাণের ক্ষেত্রে পারস্যের স্থপতিরা বহুবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন এবং এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে তাদের সামনে অজস্ত্র বিকল্প ছিল- এই প্রমাণ আমরা পাই নানাবিধ আইভানের মধ্যে। আইভানগুলো সবই এক রকমের নয়।

ইরানের গম্বুজ কিন্তু কোনক্রমেই তুর্কী গম্বুজের দ্বারা প্রভাবিত নয়। বহুকাল ধরে ইরানের মানুষ তাদের বাসগৃহে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের জন্য একপ্রকার গম্বুজ ব্যবহার করে এসেছে। সুতরাং গম্বুজটা ইরানের নিজস্ব ভার্নকুলার বা শিল্পভাষার অন্তর্গত। ইরান নিজস্ব ঐতিহ্য থেকেই গম্বুজের ধারণা পেয়েছে এবং তাদের মসজিদে সেই গম্বুজ তারা ব্যবহার করেছে। দৃশ্যত বাইজানটাইন গম্বুজ এবং ইরানী গম্বুজের মধ্যে পার্থক্য আছে। নির্মাণ পদ্ধতিতে এদের উভয়ের জটিলতা ব্যাখ্যা না করে বলা যায় যে, এই দুই গম্বুজ রীতিগতভাবে ভিন্ন প্রকৃতির।

চিত্রকলা ও ক্ষুদ্রচিত্র

চিত্রকলা ও ক্ষুদ্রচিত্র শিল্প আরেক বিস্ময়। মুর‌্যাল পেইন্টিং থেকে শুরু করে ওয়ালপেইন্টিং সর্বত্রই সাংস্কৃতির দৃঢ় অভিব্যক্তি পাওয়া যায়। পার্সিয়ান ও সাসানি আমলের মাঝে প্রায় ৩০০ বছর এধরনের শিল্পের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। ১৩’শ শতাব্দীর শুরুতে এসব শিল্পের হদিশ মেলা ভার। ওই সময় অবশ্য সেলজুকদের আমলে কিছু পটারি শিল্পের খোঁজ মেলে।

এছাড়া ক্যালিওগ্রাফির কথা বলতে হলে যেতে হয় ভিন্ন এক জগতে। আসে উন্নত মানের কাগজের কথা। সেই সব কাগজে ক্যালিওগ্রাফি এক বিমূর্ত শিল্প হয়ে ওঠে। শুধু কি কাগজ? তার বাঁধাই, আলোকসজ্জা, ঐশ্বর্য আর শৌখিনতা ক্যালিওগ্রাফিকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। চিত্রন বা ইলাস্ট্রেশন ছিল অভূতপূর্ব। শুধু মুসলিম নয় সমসাময়িক খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ সমাজ, রাজকীয় ও ধনী সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত প্রভাবশালীদের সংস্কৃতির প্রতি দরদি মনোভাব পরিস্ফুটন হয়ে উঠেছে নানা শিল্পকর্মে। এর সুপ্রভাব পড়েছে ধর্মীয় কাজেও। সংস্কৃতি থেকে ধর্ম কখনো বিচ্ছিন্ন ছিল না। সেই ভাবধারা থেকে বর্তমান বিশ্বের অনেকে এখন বঞ্চিত।

পারস্যের শিল্প ও সংস্কৃতির এধরনের শৈল্পিক উদাহরণ বই বিনষ্টের মধ্যে দিয়ে হারিয়ে যাওয়ার মত ঘটনা ঘটে। ইঁদুর বা পোকামাকড় কাটার পাশাপাশি বিদেশি শক্তির আধিপত্যবাদী সম্প্রসারণেও এধরনের সাংস্কৃতিক সৌন্দর্যের বিকশিত ধারা কখনো কখনো থমকে গেছে। আবার পুনরায় নতুন করে যাত্রা শুরু করেছে। এখনো যদি আপনি কোম নগরীতে যান তাহলে সেখানে দেখতে পাবেন বইয়ের জন্যে হাসপাতাল রয়েছে।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না ক্যালিওগ্রাফির ক্ষেত্রে শিল্পীদের অঙ্কনের প্রতি গুরুত্বের সাথে সাথে রং ও নকশার দিকে সমান গুরুত্ব দিতেন। এব্যাপারে তাদের ইন্দ্রিয় ছিল প্রখর। যেমন লাল রংয়ের পটভূমি ও অঙ্কনের বৈশিষ্ট দেখে বলে দেয়া যায় ১৩৩০ থেকে ১৩৫৩ সালের মধ্যে সিরাজ এলাকার ক্যালিওগ্রাফিগুলোকে। রাজকুমার ইব্রাহিম সুলতান চিত্রশিল্পের প্রতি তার পৃষ্ঠপোষকতা এক উদাহরণ হয়ে আছে। নিসর্গ, ভূখন্ডের অপরুপ সব প্রতিচ্ছবি চিত্রশিল্পে ভর করে উঠত। ১৫’শ শতাব্দীতে এসব চিত্রশিল্পে পাথুরে ভূমি, ঝোঁপঝাড়, ঘাঁস, বুনোফুল এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। তুর্কমেন উপজাতিরা এসব চিত্রকর্ম যখন সিরাজে নিয়ে যায় তখন তার রংয়ের বৈশিষ্টে পরিবর্তন নিয়ে আসে। এভাবে ধারাবাহিক এক বৈশিষ্ট থেকে আরেক বৈশিষ্টে রুপান্তর ছিল অবিরাম। কখনো আগুনের গনগনে চিত্র আবার সেলজুক রীতিতে অঙ্কিত চাঁদের মুখ নজর কাড়া সৌন্দর্যে চিত্রকলায় প্রতিবিম্বিত হয়ে ওঠে।

১৪১০ সালের দিকে সুলতান এসকান্দারের জন্যে রচিত ফার্সি কবিতার মধ্যে পারস্য ধারার বেশ উন্নয়ন ঘটে। মঙ্গলদের ধংসাত্মক কার্যকলাপের পরে শিল্প সংস্কৃতি রক্ষায় ইরানের ইলখানি শাসকদের মধ্যে তৎপরতা দেখা যায় যার একটি নমুনা হচ্ছে একটি বহুমুখী আদালত স্থাপন করা হয় যার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন ইতিহাসবেত্তা, কবি, জ্যেতির্বিজ্ঞানী, চিত্রশিল্পী প্রমুখ। এসময় ইরানের সংস্কৃতির এক নতুন আবহ ও প্রভ’ত উন্নতি সাধন হয়। মঙ্গলদের মাধ্যমে চীন সংস্কৃতি এসময় পারস্যের সংস্কৃতির সঙ্গে এক নতুন আবহ সৃষ্টি করে। পান্ডুলিপির এক টেকসই রক্ষণাবেক্ষণ গড়ে ওঠে। অনেক চিত্রশালায় পটুয়ারা নতুন আঙ্গিক রপ্ত করে। ১৪’শ শতকের মাঝামাঝি সিরাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য সংস্কৃতির কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তখন বাগদাদ, তাব্রিজ শুধু সিরাজের সমকক্ষ ছিল।

ইরানের ক্যালিওগ্রাফি বৈশিষ্টগুলোর মধ্যে নাসতালিক এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে আছে। এসব শিল্পকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শেষ মহান তিমুরিদ, হোসেন বায়গারা, কবি জামি, চিত্রশিল্পী বেহজাদ, ক্যালিওগ্রাফি শিল্পী সুলতান আলি ইবনে লোহাম্মাদ আল-মাশহাদি ও মির আলি হোসেনের নাম। ১৫০৭ সালে যখন উজবেকদের হাতে হেরাতের পতন হয় তখন মির আলি হোসেন বুখারা চলে যান। সেখানে তিনি একটি ক্যালিওগ্রাফির স্কুল খোলেন। ইস্ফাহানে তখন ক্যালিওগ্রাফির স্কুল ছিল। মির মোহাম্মদ কাসেম খান ছিলেন স্বনামধন্য পান্ডুলিপি বিশারদ। এমাদ ছিলেন নাসতালিক বৈশিষ্টের ক্যালিওগ্রাফি শিল্পী। আলিরেজা আব্বাসি তাদের মধ্যে স্মারক শিলালিপিতে অসামান্য দক্ষতা দেখান। সাফাবি শাসনামলের শেষ ভাগে নাস্তালিক বৈশিষ্ট শুরু হয়। আর ১৮’শ শতাব্দীর প্রথমদিক পর্যন্ত নাশখ বৈশিষ্টের শিল্পী ছিলেন আহমেদ নেইরিজি।

দীর্ঘ ইতিহাসের গতিপথে ইরানি ক্যালিওগ্রাফি যে শুধু পান্ডুলিপিতে সীমাবদ্ধ থেকেছে তা কিন্তু নয়, তা উঠে এসেছে ভবনের দেওয়ালে, সিরামিক শিল্পে, ধাতব কাজে, মুদ্রায়, পাথর খোদাই করা শিলালিপিতে, বস্ত্রের ডিজাইনে এবং এভাবে ক্যালিওগ্রাফির ব্যবহার সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর হয়ে উঠেছে। এখনো যে সুন্দর হস্তাক্ষরের এত কদর তার উত্তরসূরী হিসেবে ক্যালিওগ্রাফিকে অনেকে জনক মানেন।

সেকালে শিল্পের প্রতি কতটা দরদ ছিল তার একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ১৭৭৬ সালে তাব্রিজে ভয়াবহ এক ভ’মিকম্প অনেক ক্ষতিসাধন হয়। উদ্ধারকর্মীরা ভবনের ভগ্নস্তুপ সরিয়ে সুরঙ্গ খুড়ে উদ্ধারকাজ চালানোর সময় দেখতে পান একটি ভবনের বেসমেন্টের ভেতর থেকে আলো ঠিকরে বের হয়ে আসছে। তারা সেখানে কেউ বেঁচে আছে কি না তার খোঁজ করতে গেল দেখতে পান মেঝেতে এক ব্যক্তি আনমনে বসে কি যেন লিখছেন। তারা তাকে বেশ কয়েকবার চিৎকার করে দ্রুত বের হয়ে আসতে বললেও তার মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের চিল্লাচিল্লিতে ওই ব্যক্তি যখন সম্বিত ফিরে পেলেন তখন তিনি তাদের বিরক্ত না করার জন্যে বললেন। উত্তরে উদ্ধারকর্মীরা ভূমিকম্প হয়েছে এবং তাকে উদ্ধারের সামান্য সুযোগ আছে জানালে ওই ব্যক্তি প্রতিউত্তরে বললেন, তাতে তার কি আসে যায়? বরং ওই ব্যক্তি গর্বের সঙ্গে একটি কাগজ দেখিয়ে বলল, হাজার বার চেষ্টার পর আমি শেষপর্যন্ত উপযুক্ত অক্ষরটি অঙ্কন করতে পেরেছি। এর মূল্য সারা শহর ও আমার জীবনের চেয়ে কি অধিক মূল্যবান নয়?

এবার মাটির পাত্র ও টাইলকাজ নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করা যাক। সিরামিকের চেয়ে মাটির তৈজসপাত্র থেকে শুরু করে শোপিস ইরানে অনেক বেশি অলংকারসমৃদ্ধ । বিভিন্ন ধরনের রকমফের খুঁজে পাবেন আপনি এসব মৃৎশিল্পে। যেমন রং তেমনি কারুকাজ ও তাও খুব সূক্ষè ধরনের। দূর থেকে দেখলে কাছে যেয়ে দেখতে ইচ্ছে জাগে, কাছে গেলে সত্যিই বিস্ময় বোধ হয় অসাধারণ সূক্ষè কারুকাজ দেখে। এসব কাজ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে একধরনের অন্তমিল খুঁজে পাওয়া যায়। কারুকাজের ফর্ম ব্যবহার কিন্তু সব অসীম নয়। বেশিরভাগ পাত্র গতানুগতিক ও সুস্পষ্ট কারুকাজ খচিত। কিন্তু সূক্ষè তারতম্য ভাল করে খেয়াল করলে সুস্পষ্টভাবেই তা মহামূল্যবান হয়ে ওঠে। সমবায় ভিত্তিক শিল্পের সাহচর্যে পটারি শিল্প অগ্রযাত্রা লাভ করে। স্বাভাবিকভাবেই এধরনের অগ্রযাত্রায় কুমার, চিত্রক ও খোদক যুক্ত ছিল। ১২’শ শতাব্দীতে কাশান ছিল বিখ্যাত এধরনের পটারি শিল্পের জন্যে। একক রং থেকে শুরু করে অস্বচ্ছ, ধূসর বা সাদাটে, বাদামী বা কোবাল্ট নীল আবার কখনো স্বচ্ছ চকচকে কোনো রংয়ে আবৃত থাকত এসব তৈজসপাত্র। চীনের মৃৎশিল্পের প্রভাব অস্বীকার করেই ইরানি মৃৎশিল্পের কেন্দ্র হয়ে ওঠে সুলতানাবাদ। তারপর ১৬’শ শতাব্দীতে কেরমান ও মাশহাদে ছড়িয়ে পড়ে এ শিল্প। পরের অর্থাৎ ১৭’শ শতাব্দীতে সিরামিক শিল্পের উত্তরণ ঘটে। তার পর চীনের মৃৎশিল্পের প্রভাব, জাপানের পোসালিনের পণ্য ইউরোপের সাদা ও নীল রংয়ের তৈজসপত্র এসে বাজার দখল করায় পারস্য পটারিশিল্প অনেকটা কোনঠাসা হয়ে পড়ে। কিন্তু তারপরও পারস্যের পটারিশিল্প একটা স্থায়ী আসন দখল করে রাখে।

ভবনে টাইলস ব্যবহারে পারস্য রীতি নিজস্ব। স্থাপত্যরীতি মেনেই টাইলস ব্যবহার রীতিমত বিস্ময়কর। দুই ধরনের টাইলস ব্যবহার হয় ইরানি ভবনগুলোতে। ১৯২১সালে ন্যাশনাল গার্ডেনের যে গেটটি নির্মিত হয় টাইলস ব্যবহার করে তা ইরানি রীতি মেনেই করা হয়েছে। নীল, কালো, কমলা, হলুদ, সাদা, নেভিব্লু, সবুজ, গোলাপি রংয়ের টাইলস’এর মানানসই ব্যবহার ঐতিহ্য থেকে ঐশ্বর্যে পরিণত হয়েছিল। কিছু টাইলস ছিল ঝিলিক বা চকচকে ধরনের। আর টাইলস ছাড়াও ভবন নির্মাণের কৌশল সম্পর্কে বলতে হয় নির্মাণ শিল্পের কাঁচামাল ছিল তুলনামূলকভাবে সস্তা। মাটি রোদে পুড়িয়ে বা শুকিয়ে ইট তৈরির কলাকৌশলে সহজ নকশা ব্যবহার হত। কিন্তু ভবনগুলো ছিল আবহাওয়া ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো ও টেকসই। ধুলিঝড় থেকে বরফপাত কিংবা গরম ও ঠান্ডায় ভবনগুলো নিজ বৈশিষ্টে প্রতিরোধক্ষম ছিল।

সঙ্গীত

বলার অপেক্ষা রাখে না সঙ্গীত ইরানের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রাচীনত্বকে উপস্থাপন করে। এককভাবে কোনো বালিকার সঙ্গীতের মূর্ছণা একিমিনীয় সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ফুটিয়ে তুলত। গ্রিক ঐতিহাসিকরা বলেন, যখন গ্রিক যোদ্ধারা পারমেনিয় লিমাসকাস দখল করেন, তখন শত শত গায়কের দায়িত্ব তিনি গ্রহণ করেন। সাসানিদের আমলে বিশাল সঙ্গীত সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। এসময় ভারতবর্ষ থেকে নৃত্যশিল্পীরা এসে ইরানে বসতি গড়ে তোলে। আবার ভারত ও তুরস্ক ইরানের সঙ্গীত প্রতিভা দ্বারা প্রভাবিত হয়।

এছাড়া চিত্রশিল্পীরা সঙ্গেীতেও পারদর্শী ছিলেন। সরকারের পক্ষ থেকে সঙ্গীতজ্ঞদের পৃষ্ঠপোষকতা করা হত। সাহিত্যে সঙ্গীতের একটি আসন ছিল পাকাপোক্ত। আরবীতে আল-ফারাবির লিখিত সঙ্গীতের উপর বই ছিল বিখ্যাত। ইলখান শাসনামলে নাসির আল-দিন তুসি ছিলেন এমন একজন মন্ত্রী যার সঙ্গীতের প্রতি অগাধ ভক্তি ও ভালবাসা ছিল। সে সময় কাজার  শাসনামল ছিল। এর আগে সঙ্গীতের ওপর আরব প্রভাব দেখা যায়।

আবার এও দেখা গেছে শিয়া সাভাবি রাজকীয় আদালত কিংবা রাজবংশের শিয়া আলেমরা বাদ্যযন্ত্রেও ব্যবহার বা একই সঙ্গে সঙ্গীতের অভিব্যক্তি নিয়ে কিছুটা ভ্রুকুঞ্চিত করলেও সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষকতা যথারীতি বহাল তবিয়তে এগিয়ে গেছে। এখনো সঙ্গীতে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করার মত।

ইরানের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের উপস্থাপনায় একজন গায়কের সঙ্গে জনা দুয়েক সহশিল্পী অংশ নিতেন। বাদ্যযন্ত্রগুলো ছিল ছোটখাট থেকে মাঝারি আকারের। এসব বাদ্যযন্ত্রের একটি ছিল বাঁশির মত যার নাম হচ্ছে ‘নায়’। ৬টি গর্ত সংযুক্ত থাকে সামনে ও পেছনে আরো একটি গর্ত থাকে। এ বাদ্যযন্ত্রটি ব্যবহারের সময় গর্তগুলো আঙ্গুলের সাহায্যে নিয়ন্ত্রণ করা হয় যেমন বাঁশরীয়া তার বাঁশীতে সুর তোলেন।

আরেকটি বাদ্যযন্ত্র হচ্ছে ‘তার’। গিটারের মত দেখতে এ বাদ্যযন্ত্রে ৬টি তারের ৫টি স্টিলের ও ১টি পিতলের। এসব তারগুলো পাশাপাশি সমান্তরালভাবে একটি মিউজিক বাক্সের ওপর স্থাপিত থাকে। বাদ্যযন্ত্রটি বাদক বাজিয়ে ২৬টি ভিন্ন ভিন্ন সুর তুলে সঙ্গীত পরিবেশন করেন।

সেতার বাংলাদেশে পরিচিত বাদ্যযন্ত্র। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিল্পীরা সাধারণত ব্যবহার করে থাকেন। ইরানে এটির কদর বেশ।

উদ নামে আরেকটি বাদ্যযন্ত্র এবং এ নামটি আরবীয়। উদ পারস্যের প্রাচীন সঙ্গীতযন্ত্র বলা যায়। ৯ থেকে ১১টি তার সংযুক্ত থাকে উদে।

বেশ বড় একটি বাক্সবিশিষ্ট সঙ্গীতযন্ত্রের নাম ‘সানতুর’। বাক্সের ভেতরে বিভিন্ন ধরনের শব্দ সংযুক্ত করা আছে। চারটি ভাগে সানতুরে ৭২টি তার যুক্ত রয়েছে। বিশেষ কায়দায় এ সঙ্গীতযন্ত্র বাজিয়ে থাকেন সঙ্গীত শিল্পীরা।

‘তমবাক’ দেখতে অনেকটা ফুলদানির আকৃতির মত ঢোলের ন্যায়। নিচের দিকে খোলা এবং ওপরের দিকে ভেড়ার চামড়া দিয়ে শক্তভাবে আটকানো। এটি বাদ্যযন্ত্রের মত বেজে ওঠে না। হাত দিয়ে আঘাত করে তবলার মত বাজাতে হয়।

‘দফ’ ঢোলের মত তবে তা থালার মত চ্যাপ্টা এবং একদিকে খোলা। বেশ জনপ্রিয় এ দফ আরব থেকে এসেছে। এশিয়া ও উত্তর আমেরিকায় দফ বেশ জনপ্রিয়। যুদ্ধের ময়দানে দফ বাজানো হয় দীর্ঘকাল থেকে। দফ হাতে নেচে গেয়ে ওঠে অনেক নারী ও পুরুষ।

পারসিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ যা ফার্সি ভাষা হিসেবে পরিচিত। ভারতবর্ষে মুসলমানদের শাসনামলে ফার্সি ভাষা ছিল রাজভাষা। একারণে বাংলাভাষায় এখনো প্রচুর ফার্সি ভাসা ব্যবহার হয়ে থাকে। যা বাংলা সাহিত্য ও কবিতায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ থেকে শুরু করে আরো অনেকে ব্যবহার করেছেন। প্রতিদিন আমাদের বাংলাভাষায় ব্যবহৃত শব্দ যে ফার্সি তা অনেকের অজানা। যেমন, আবহাওয়া শব্দটির আব অর্থ পানি ও হাওয়া অর্থ বাতাস অর্থাৎ পানি ও বাতাস মিলে আবহাওয়া হয়েছে। তেমনি বাবা, পা, দরদ, পিয়াজ, দূর এমন হাজার হাজার শব্দ আমরা বাংলা হিসেবে জানি যা আদতে ফার্সি শব্দ।

ফার্সি ভাষা ইন্দো-ইউরোপিয় ভাষার পরিবার থেকে জন্ম হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে ফার্সি প্রাচীন, মধ্যকাল ও আধুনিক এ তিনভাগে বিভক্ত। প্রাচীন ফার্সিও উৎপত্তি ধরা হয় তৃতীয় শতাব্দীতে। সেই ব্যবিলনীয় সভ্যতার সময় মহান দানিয়ুস প্রাচীন ফার্সিভাষা আবিস্কার করেন। এরপর এলামাইট ও একিমিনীয়রা ফার্সি ভাষা ব্যবহার করে। জরথ্রুস্তদের ধর্মগ্রন্থ ‘আভেস্তা’ লিখিত ছিল প্রাচীন ফার্সি ভাষায়। এরপর নবম শতাব্দী পর্যন্ত প্রাচীন ফার্সি মধ্যফার্সি ভাষা হিসেবে চালু থাকে এবং আধুনিক ফার্সিভাষার ক্রমবিকাশ শুরু হয়। মাঝখানে কিন্তু হাজার বছর অতিক্রান্ত হয়ে যায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে ইরানিদের আদি ভাষা কিন্তু ছিল আরবি। মানে ইসলামে খলিফাদের যুগ। অভিযোগ ওঠে বিজয়ী আরবরা পারস্যের প্রাচীন সাহিত্য ধ্বংস করেন কিন্তু গীবন থেকে শুরু করে আরো অনেক ঐতিহাসিক এ অভিযোগ অমূলক প্রমাণ করেছেন। পাহলভি স্ক্রিপ্ট রেখে পারস্যবাসি তখন আরবি স্ক্রিপ্ট ব্যবহার করতে শুরু করে। কিন্তু ফার্সিভাষা হারিয়ে যায়নি। তবে ফার্সি ভাষা ইরানের আশে পাশে পারস্য শাসক ও মুসলমান শাসকদের মাধ্যমে অন্যান্য ভাষা যেমন হিন্দি বা তুর্কি ভাষার ওপর বিশাল প্রভাব বিস্তার করে। যেমন ধীরে বাংলা শব্দটি অহেস্তে ফার্সি থেকে হিন্দিতে আহিস্তি বা বাংলায় আস্তে পর্যন্ত রুপান্তরিত হয়েছে। ফার্সি ভাষাই উর্দু ভাষার জনক।

ফার্সি ভাষার প্রাচীন কবি হচ্ছেন রুদাকি পাহলাভি স্ক্রিপ্ট রচনা করেন। তিনি মারা যান ৯৪০ খ্রিস্টাব্দে। প্রাচীন ফার্সি ভাষার পান্ডুলিপির সন্ধান পাওয়া যায়নি। মুখে মুখে এ ভাষায় রচিত কবিতা যুগের পর যুগ টিকে থাকে। তবে ফার্সি ভাষা শুনলে আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে ‘শাহনামা’র কথা। এখন পর্যন্ত শাহনামার যতগুলো হাতে লিখিত কপি পাওয়া গিয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে পুরাতন খন্ডটি ১২৭৬ থেকে ৭৭ সালে তৈরি। তার মানে মূল রচনার সাথে এ কপিটির পার্থক্য আড়াই’শ বছর। আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে এর আগের কোনো শাহনামা কপি এখনো পাওয়া যায়নি। শাহনামাকে বলা হয় পূর্বের ‘ইলিয়াড’।

হাজার বছর কেটে গেছে। তারপরও মর্মর সৌধের মত শাহনামা এক অলৌকিক প্রতিভার স্বাক্ষর বহর করছে। এ কাব্যের জন্যে প্রাচ্য ও প্রতীচ্য উভয় মহাদেশের প-িতরা ফেরদৌসীকে ‘ইরানের হোমার’ বলে অভিনন্দিত করেছেন। শাহনামা পৃথিবীর মহাকাব্যসমূহের মধ্যে অন্যতম। সাতটি বড় খন্ডে বিভক্ত মহাকাব্যটি ষাট হাজার শ্লোকে সমাপ্ত। ফেরদৌসী অবিমিশ্র ফার্সি ভাষায় শাহনামা রচনা করেন।

প্রাচীন প্রাগ-ঐতিহাসিক শাসনামল থেকে আরবদের কর্তৃত্ব পারস্য বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত পারস্যের গৌরবময় পুরাবৃত্ত কাব্যের মধ্যে দিয়ে শাহনামায় বর্ণিত রয়েছে। লোক-গাঁথা, গল্প, উপাখ্যান, কিংবদন্তী, ইতিহাস ও ধর্মগ্রন্থগুলো থেকে এর উপকরণ নেয়া হয়েছে। শাহনামার ঘটনাবলির বিস্তৃতিকাল তিন হাজার আট’শ চুয়াত্তর বছর এবং উনচল্লিশটি রাজবংশের শাসনকালের বিস্তৃত বিবরণী। প্রথম তিন হাজার বছরের কাহিনী নিছক উপাখ্যানভিত্তিক। পরবর্তী নয় শতাব্দীর ঘটনাবলি ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত।

ফেরদৌসী ৯৪১ সালে সমরখন্দের তুস নগরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার প্রচুর জমিজমা ছিল। ভাল লেখাপড়া করেছিলেন ফেরদৌসী। ছোট বেলা থেকে কবিতা লিখতেন। যৌবনে একান্তভাবে কবিতা চর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। তার একটি মাত্র কন্যা ছিল যাকে নিয়ে তার উচ্চাভিলাষ ছিল যে তাকে তিনি উপযুক্ত যৌতুক দিয়ে বিয়ে দেবেন। যৌতুকের অর্থ সংগ্রহে তিনি শাহনামার কবিতা রচনা শেষ করেন। তার পর সুলতান মাহমুদ গজনীর সিংহাসনে আরোহন করেন। সুলতান এ কাব্য দেখে মুগ্ধ হয়ে শাহনামার ষাট হাজার শ্লোকের জন্যে ষাট হাজার রৌপ্য মুদ্রা দেন। কিন্তু কবির আশা ছিল আরো বেশি, নেহাত স্বর্ণমুদ্রা হলেও তিনি হয়ত খুশি হতেন। জীবনের সেরা ৩০টি বছর এ কবিতার পেছনে ফেরদৌসীর অতিবাহিত হয়েছে। তার মূল্য রৌপ্যমুদ্রা? অভিমানে তিনি এসব মুদ্রা তার শরবত বিক্রেতা, হাম্মাম খানার তত্ত্বাবধায়ক ও পুরস্কার বহনকারীদের বিতরণ করে দিয়ে তিনি গজনী ত্যাগ করেন।

ফেরদৌসীর বয়স তখন ৭০/৭১ বছর। এরপর তিনি ৮/৯ বছর বেঁচে ছিলেন। ১০২০সালে তিনি ৭৯ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তুস নগরে তাকে সমাহিত করা হয়। শাহনামার উপসংহারে তিনি লিখেছিলেন, এ কাব্য অনেক শৌর্যবীর্য ও বীরত্বেও এক উজ্জবল আলেখ্য। এ কাহিনী ইরানের প্রত্যেক চিত্তকে জাগ্রত করবে এবং এর সুর তাদেরকে গৌরবজনক কাজের দিকে প্রেরণা দিবে। একজন লজ্জাবতী ললনাও যদি এ কাব্য পাঠ করে, সে একজন সাহসী যোদ্ধায় পরিণত হবে।

বৃদ্ধ বয়সে ফেরদৌসী ‘ইউসুফ জুলেখা’ নামে ১৮ হাজার পদ বিশিষ্ট আরও একটি কাব্য রচনা করেন।

রোস্তম-সোহরাব কাহিনী

বীরশ্রেষ্ঠ রোস্তম ছিলেন ইরানের সেনাপতি। পারস্যের বীরত্বগাঁথা সাহিত্যে তার প্রভাবশালী চরিত্র অনন্য নজীর স্থাপন করে আছে। দাস্তানে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। মাতৃগর্ভে রোস্তমের অস্বাভাবিক আকারের জন্যে তার জন্ম হয় সিজারিয়ান পদ্ধতিতে। কথিত আছে একটি অলৌকিক পাখি তার পরিবারকে সবসময় সাহায্য করত। বালক বয়স থেকে তার বীরত্ব ও সাহসের কথা চারপাশে ছড়িয়ে যায়। রোস্তমের বয়স যখন মাত্র ৮ বছর তখন এক ক্ষিপ্ত বন্য হাতিকে তিনি পরাস্ত করেন।

সেনাপতি রোস্তম শিকারে বের হয়ে তুরান দেশের এক অরণ্যে ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুম থেকে উঠে তিনি দেখেন তার প্রিয় ঘোড়া ‘রুখশ’ চুরি হয়ে গেছে। ঘোড়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি অরণ্য থেকে বের হয়ে এসে শামিঙ্গনের রাজধানীতে পৌঁছান। তাকে চিনতে পেরে দেশটির রাজা তার ঘোড়া খুঁজে দেন। রাজগৃহে অবস্থানের সময় রাজার পরম সুন্দরী কন্যা তাহমিনার প্রেমে পড়েন রোস্তম। তাদের বিয়ে হয়। এভাবে কিছুদিন কেটে যাওয়ার পর তার ইরানের কথা মনে পড়ে। তাহমিনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দেশে ফেরেন। তাহমিনাকে একটি মোহর দিয়ে বলেন, তার নামাঙ্কিত এ মোহরটি পুত্র সন্তান হলে যেন তার বাজুবন্ধে বেঁধে দেয়ওয়া হয়। যা তার পিতৃপরিচয় দেবে।

তাহমিনার পুত্র সন্তান হলে তার নাম রাখলেন সোহরাব। পুত্রকে নিয়ে যাবেন রোস্তম এই ভয়ে তাহমিনা তার স্বামীর কাছে খবর পাঠালেন কন্যা সন্তান হয়েছে। রোস্তম নিরুৎসাহীত হয়ে পড়েন। এভাবে কুড়ি বছর চলে গেল। পিতৃপরিচয় নিয়ে সোহরাবের বন্ধুরা তাকে নানাধরনের বিদ্রুপ করত। পিতার কীর্তি তাকে প্রেরণা যেগাত। পিতৃখোঁজে সোহরাব বের হলেন সহ¯্রাধিক সৈন্য সামন্ত নিয়ে। তার বাসনা পিতাকে খুঁজে বের করে তিনি ইরানের সিংহাসনে তাকে বসাবেন। পথিমধ্যে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ হল। সোহরাব একের পর এক যুদ্ধে জয়লাভ করে ইরান পৌঁছালেন। ইরান স¤্রাট কায়-কায়স সোহরাবের পরিচয় রোস্তমের কাছে গোপন করে তাদের যুদ্ধের ময়দানে কৌশলে মুখোমুখি করে দিলেন। দিনের পর দিন পিতা ও পুত্রের মধ্যে যুদ্ধ হয়। কেউ পরাস্ত হয় না। কেউ কারো পরিচয় স্বীকার করে না। এক পর্যায়ে সোহরাব মল্লযুদ্ধে রোস্তমকে পরাস্ত করেন। কিন্তু পারস্য যুদ্ধের রীতি অনুযায়ী প্রথমবার পরাস্ত করলেও পুনরায় যুদ্ধে চূড়ান্ত ফয়সালা হওয়ার নিয়ম। তাই ফের পিতা পুত্রের লড়াই চলতে লাগল। দিন কয়েক এভাবে চলার পর এবার পরাস্ত পুত্র পিতাকে বললেন, আপনিতো বললেন প্রথম পরাস্তই চূড়ান্ত বিজয় নয়। আরেকবার লড়াই হোক। কিন্তু পিতা রোস্তম সে সুযোগ না দিয়ে পুত্র সোহরাবের বক্ষ খঞ্জরে বিদীর্ণ করলেন। মুত্যুর আগে দুজনেই দুজনার পরিচয় জিজ্ঞেস করলে সোহরাব তার বাজুবন্ধে বাঁধা রোস্তমের নামাঙ্কিত মোহরটি দেখালে মৃতপ্রায় পুত্রকে কোলে টেনে নেন পিতা। শেষমূহুর্তে পিতাপুত্রের যুদ্ধের ময়দানে সম্মুখ সমরে লিপ্ত থাকার কথা শুনে তাহমিনা যখন এসে পৌঁছালেন ততক্ষণে সোহরাব তাদের ফাঁকি দিয়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

পারস্যের সাহিত্য বা ফার্সি ভাষায় যেমন বীরত্ব কাহিনীতে ভরপুর তেমনি ইতিহাস ঐতিহ্যে এ ভাষা মিষ্টি মধুর ও সহজ বোধ্য। অলঙ্করণের জন্যে ফার্সির এ স্বাদ দেশ থেকে দেশান্তরে খুব সহজে ছড়িয়ে পড়েছিল। আধ্যাত্মিকতা সহজেই এ ভাষার ওপর ভর করে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে মরমী সাধকদের মনে ও প্রাণে। মাত্র একটি লাইনেই ফার্সি ভাষায় জীবন ও জগতের গভীর থেকে গভীরতর মর্মবাণী বা গভীর কোনো চিন্তা সহজবোধ্য হয়ে ধরা দেয়। আবার আধুনিক ফার্সি কবিতা সর্বশ্রেষ্ঠ ছন্দোময় সঙ্গীতময়তা ও শব্দের মিশুক অর্থ মিলে অসাধারণ এক কাব্যময় হয়ে ওঠে। পূর্ববতী সঙ্গীতময়তার সঙ্গে ভাষাগত কমনীয়তা মিলে এক অত্যাশ্চর্য দ্যুতির সৃষ্টি করে। ঐতিহ্যবাহী পারস্য কাব্য থেকে শুরু কওে কাসিদা, মসনভি, গজল ও রুবাইয়াৎ একটির তুলনা কোনোটির সঙ্গে চলে না। ওমর খৈয়াম, সাদি, হাফেজের মত মহাকবিরা এ ফার্সি ভাষায় তাই বিশ্ব শ্রেষ্ঠ সাহিত্য, মহাকাব্য রচনা করেছেন মেধা, মনন ও প্রবল বাগ্মীতায় অনায়াসে। বিজ্ঞান সাধনা, গণিতের জটিল সূত্রের উদ্ভাবন ও বিভিন্ন সমস্যার উপমা ও ছক তৈরি করেছে ফার্সি ভাষায়।

ওমর খৈয়াম

ওমর খৈয়াম জন্মগ্রহণ করেন ১০৪৮ সালে খোরাসানের নিশাপুরে। খৈয়াম শব্দের অর্থ তাবু প্রস্তুত কারক। পুরো নাম গিয়াস আল-দিন আবুলফাত ওমর ইবনে ইব্রাহিম আল-নিশাপুরি।

ওমর খৈয়ামের বয়স যখন ২৫ বছর তখন সঙ্গীত ও বীজগণিতের ওপর তার দুটি বই বাজারে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। ১০৭০ সালে ওমর খৈয়াম প্রখ্যাত আইনজীবী আবু তাহেরের আমন্ত্রণে সমরখন্দে যান এবং সেখানে বীজগণিতের সমস্যা নিয়ে তার বিখ্যাত বই ‘টিরেটাইজ অন ডেমোস্ট্রেশন অব প্রবলেম অব এ্যালজাব্রা’ রচনা করেন। এরপর ইস্ফাহানে ওমর খৈয়াম স্থাপন করে বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। এরপর তিনি মার্ভে চলে যান। যা আজকের তুর্কেমেনিস্তান হিসেবে পরিচিত। সেই সময় মার্ভ ইসলামি শিক্ষা ও গবেষণা জন্যে বিখ্যাত ছিল। গণিতের বিভিন্ন বিভাগ যেমন কিউবিক ফরমুলা বা জ্যামিতির বৃত্ত সম্পর্কিত নানা ধরনের জটিল সমীকরণের সমাধান করেন। অনুপাত ও সমানুপাত নিয়েও গণিতের বিভিন্ন ফয়সালা দেন খৈয়াম। কবিতার জন্যে যতটা বিখ্যাত হয়ে আছেন ওমর খৈয়াম, বিজ্ঞান, গণিত সাধনার জন্যেও তিনি সমান পারদর্শী ছিলেন। ১১২৩ সালে নিশাপুরে পরলোকগমন করেন ওমর খৈয়াম। পশ্চিমা দুনিয়ায় সাহিত্যকর্মের জন্যে অসাধারণ খ্যাতি অর্জন করেন তিনি। তার বিখ্যাত কবিতা ‘নগদ যা পাও হাত পেতে নাও, বাকির খাতায় শুন্য থাক, দূরের বাদ্য লাভ কি শুনে, বাজখানে যে বেজায় ফাঁকা’ এমন অসংখ্য চরণ ও সাহিত্য কর্ম দেশকাল অতিক্রম করে আজো মানুষের মনে অনুরণিত হচ্ছে। ওমর খৈয়ামের রচিত ‘রুবাইয়াৎ’ পাশ্চাত্য জগতে দারুণ সাড়া ফেলে।

আত্তার

আবু তালেব মুহম্মদ ফরিদউদ্দীন আত্তার এক আতর ব্যবসায়ীর গৃহে ১১৩০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। এজন্যে তার উপাধি আত্তার। তিনি ছিলেন চিকিৎসা ব্যবসায়ী ও ওষুধ বিক্রি করতেন। শৈশবেই আত্তার ছিলেন ধর্মীয় শিক্ষার অনুরাগী। কৈশোরে তিনি বিখ্যাত ইমাম রেজার মাজারে চলে যান। তারপর দেশভ্রমণে বের হন। হেকিম হিসেবে তিনি ছিলেন প্রখ্যাত। কাব্য রচনা, দার্শনিক চিন্তা, বিপুল বৈভব ও খ্যাতি নিয়ে ভালই ছিলেন তিনি। একদিন তার দোকানের সামনে কোথা থেকে এক ভিক্ষুক এসে ওষুধপত্রের দিকে তীক্ষè নজর রাখছিল। আত্তার বিরক্ত হয়ে বললেন, যাও আগে বাড়ো। ভিক্ষুক এই অবমাননায় ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, আমি তো যাচ্ছি, তুমি তোমার নিজের দিকে নজর কর। এবং সেখানেই তাৎক্ষণাৎ প্রাণত্যাগ করলেন ভিক্ষুকটি। এ অপ্রত্যাশিত ঘটনায় আত্তার বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়লেন। বুঝলেন তিনি যা কিছু অর্জন করেছেন তা খুবই সামান্য। কি সেই শক্তি যার বলে মানুষ ইচ্ছা মাত্রই নিজেই নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতে পারেন। পা-িত্যভিমান, সংসার ও অনিত্য বৈভব, সবকিছুর মায়া কাটিয়ে সেই যে ঘর থেকে শ্বাসত সত্যের অন্বেষণে আত্তার বের হলেন, অন্তত ৪০ বছর পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করলেন।

মুসলিম জগতে সফর পবিত্র বিষয়। অন্তত সেই যুগে সফর না করলে মানুষের শিক্ষা পরিপূর্ণ হত না। আত্তার রে, কুফা , মিসর, দামেস্ক, মক্কা, জুডা, তুর্কিস্তান, ভারতবর্ষ সহ অনেক দেশ ভ্রমণ করেন। বিভিন্ন দেশ থেকে সাধু ও দরবেশদের কাছ থেকে নানা শিক্ষামূলক রচনাবলি সংগ্রহ করেন। তার দীর্ঘস্থায়ী অধ্যবসায় ও আধ্যাত্মিক চর্চা তার জীবনকে পূতস্নিগ্ধ ও উন্নত করে। এরপর তিনি লেখায় মনোনিবেশ করেন। ১১৪টি গ্রন্থ রচনা করেন তিনি। তারমধ্যে ৩০টির হদিস পাওয়া যায়। তাযকেরাতুল আওলিয়া, পান্দনামা, লেসানুল গায়েব মত অসংখ্য বই লিখলেও জীবনে তিনি কখনো কারো স্তুতিগাথা রচনা করেননি। মহাকবি জালালউদ্দীন রুমি যাকে সুফীজগতের রুহ বলে অভিহিত করেছিলেন সেই আত্তারকেও ধর্মান্ধদের খপ্পরে পড়ে শেষ পর্যন্ত নির্বাসনে চলে যেতে হয়েছিল। ১২২১ সালে তিনি মোগলদের হাতে নিহত হন।

নেজামি

১১৪০ সালে নেজামি গাঞ্জা বা আজকের আজারবাইজানে জন্মগ্রহণ করেন। যিনি লায়লী-মজনু, খসরু-শিরী, এস্কেন্দারনামার মত অসংখ্য অমর কাব্য গ্রন্থসমূহের রচয়িতা। তার পুরো নাম নেজাম উদ্দীন আবু মুহাম্মদ ইলিয়াস। হাকিম হিসেবে তার সুপরিচিতি ছিল। সাহিত্য ও ধর্মশাস্ত্রে তিনি ছিলেন সুপ-িত। সহজ সরল জীবন যাপন করতেন নেজামি। ১২০৯ সালে তিনি মারা যান।

রুমি

জালাল আল-দিন মোহাম্মদ রুমি ‘মৌলানা’ হিসেবে পরিচিত যার অর্থ হচ্ছে পথপ্রদর্শক। রুমি ছিলেন ইরানের অন্যতম মহাকবি ও সুফি সম্রাট। আজকের আফগানিস্তানের বলখ এলাকায় ১২০৭ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। রুমির বয়স যখন ১২ বছর বয়স তখন মঙ্গলদের আগ্রাসনে তার পরিবার তুরস্কে চলে যায়। শৈশবে তিনি তার পিতার বন্ধু বিখ্যাত সাধক বোরহান আল-দিনের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। সিরিয়ার আলেপ্পো ও দামাস্কাসে বেশ কিছু বছর রুমি জ্ঞান সাধনায় মগ্ন থাকেন। অধ্যাপনাই ছিল তার জীবনের ব্রত। তার স্ত্রী খেরা খাতুন বলেছেন, পাঠগৃহে এক মানুষ উঁচু একটি দীপাধার ছিল। তার পাশে দাঁড়িয়ে রুমি সারারাত জ্ঞান সাধনা করতেন। রুমি মহাসাধক শামসতাব্রিজের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন। সাধনার সৌন্দর্যে সঙ্গীতের প্রচলনের জন্যে রুমির সমালোচনা করেছিলেন অনেকে। কিন্তু রুমির ব্যবহার ছিল অত্যন্ত নম্র ও বিনয়ী। পরিচ্ছন্ন পোশাক, লাল রংয়ের আবা ও চোগা পড়তে ভালবাসতেন রুমি। ১২৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেহত্যাগ করেন রুমি। তার রচনার প্রধান বৈশিষ্ট হল আশাবাদ। পাপময় এ সংসারে মানুষ জীবন সংগ্রামে জয়ী হবে এ সম্পর্কে তিনি কখনো তার লেখায় সন্দেহ ও নৈরাজ্যের ছায়াপাত করেননি। মসনবী ও দিওয়ান তার সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থ। দিউয়ানে প্রায় পঞ্চাশ হাজার শ্লোক রয়েছে যার সবগুলোই গজল। ইশক বা প্রেম এসব গজলের বিষয় বস্তু। এসব গজল উপস্থাপনে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার হত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *